মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী
ফেরেশতাসুলভ গুণাবলি ও মহান রবের বিশেষ রহমতলাভের যোগ্যতা অর্জনের মাস রমজানুল মোবারকের তৃতীয় দশক শুরু হয়েছে। ২০ রমজানের পর থেকে এ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত একটি বিশেষ ইবাদত রয়েছে। দিনের পুরো সময় মসজিদে অবস্থান এবং ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর এই ইবাদতের নাম ইতিকাফ।
ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত :হজরত আবু হুরাইরা (রা. বলেন, রাসুলে কারিম (স,) প্রতি রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। তারপর যখন সেই বছরটি এলো, যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস :২৪৫৮) শেষ দশকের এই ইতিকাফে লাভ করা যায় এক বিশেষ রজনি শবেকদর, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। হজরত আলী বিন হুসাইন (রা.) নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলে কারিম (স). বলেন, যে ব্যক্তি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করল, সে যেন দুই হজ ও দুই উমরাহ পালন করল।’ (বায়হাকি, দুররে মানসুর)
ইতিকাফের প্রকার :তিন ধরনের ইতিকাফ রয়েছে—ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ১. ওয়াজিব ইতিকাফ, আর তা হলো মান্নতের ইতিকাফ। সেটির পরিমাণ কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা করতে হয়। এ ইতিকাফের জন্য রোজা রাখাও আব্যশক। ২. সুন্নত ইতিকাফ, এটিই রমজানুল মুবারকের শেষ দশকের ইতিকাফ। ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগে আগে মসজিদে চলে যেতে হয়। আর তা শেষ হয় রমজান শেষ হলে। অর্থাত্, ২৯ রমজানে শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে অথবা রমজানের ৩০ তারিখ পূর্ণ হলে। এই ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া। অর্থাত্ মহল্লার মসজিদে এক-দুজন ইতিতকাফ করলে বাকি পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে জিম্মাদারি আদায় হয়ে যাবে। আর যদি কেউ আদায় না করে, তাহলে মহল্লার সব মানুষ সুন্নতে মুয়াক্কাদা পরিত্যাগ করার কারণে গোনাহগার হবে। এই ইতিকাফের জন্যও রোজা রাখা শর্ত। ৩. নফল ইতিকাফ, এই ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত নয়। পুরা এক দিন অবস্থান করাও শর্ত নয়; বরং যতটুকু সময় ইচ্ছা সুযোগ অনুসারে ইতিকাফ করার অবকাশ রয়েছে।
ইতিকাফের হেকমত ও উপকারিতা :আল্লাহর ইশক ও মহব্বতে বান্দার কাছে এমন একটা সময় আসে যে, সে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়ে একটি পর্দার পেছনে দুনিয়ার সমস্ত ব্যস্ততা থেকে বেখবর হয়ে আপন মাহবুবের সঙ্গে প্রেমালাপ ও রসালাপে ব্যস্ত থাকে। ইতিকাফকারী শুধু বাসাবাড়ি নয়; বরং প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পরিবারপরিজন সবার থেকে সম্পর্ক এ কয়েক দিনের জন্য কমিয়ে দেন।
এজন্য ইতিকাফকারীর প্রত্যেকটা মিনিট ইবাদত হিসেবে লেখা হয়। শবে কদর হাসিল করারও ইতিকাফের চেয়ে উত্তম আর কোনো উত্তম পদ্ধতি নেই। কেননা, যখনই শবে কদর আসুক, ইতিকাফকারী সর্বাবস্থায় ইবাদতে থাকে। (মিশকাত ১/১৮৬)
ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান :ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদে হারাম। অতঃপর মসজিদে নববি তারপর বায়তুল মুকাদ্দাস। এই তিন মসজিদের পরে হলো জামে মসজিদ, যাতে জুমার জামাত হয়। মহিলারা ঘরের যে স্থানে নামাজ পড়ে, সে স্থানে ইতিকাফ করা উত্তম। অন্যথায় কোনো কামরায় নিজের জন্য কোনো স্থান বানিয়ে নেওয়া। (ইলমুল ফিকহ ৩/৪৬)
ইতিকাফকারীর ইবাদত :ইতিকাফের সৌভাগ্য অর্জনকারীর জন্য কর্তব্য হবে প্রত্যেকটা মুহূর্তকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। ন্যূনতম সময় বিশ্রাম ও নিদ্রায় কাটিয়ে বাকি পুরো সময় নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও তসবিহ-তাহলিলে সময় কাটানোর চেষ্টা করা। জবানকে আল্লাহর জিকিরে সুরভিত রাখা। সুন্নতের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।
লেখক :সিনিয়র শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, ৪৩ নবাব সলিমুল্লাহ রোড, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ