মওলানা শাহ সুফি অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ুম
রমাদান মাসের শেষ জুমুআকে জুমুআতুল বিদা বলা হয় এ কারণে যে রমাদানের এই জুমুআতে জুমুআর খুতবায় মাহে রমাদানুল মুবারককে এক বছরের জন্য আল বিদা জানানো হয়। রমাদান মাস বছরের শ্রেষ্ঠ মাস, আর জুমুআর দিন সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। এই দুই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারীর মিলনের সমাপ্তি দিনে এক করুণ বিরহবিচ্ছেদের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মসজিদগুলোতে জুমুআর সালাত আদায়ের জন্য মুসল্লিদের ভিড় জমে এমন করে যে মসজিদ পেরিয়ে রাস্তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তা বিস্তৃত হয়। এই দিনে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেন হূদয়ের গভীরের আপনজনের বিদায় দিতে সবাই সমবেত হয়েছে। পবিত্রতার সৌরভমাখা জুমুআর এই দিন সবার চিত্তে দারুণ শোক-বেদনা সঞ্চারিত হয়। এই দিনকার খুতবায় ইমাম সাহেব যে খুতবা দেন, তাতে বারবার উচ্চারিত হতে থাকে আল বিদা আল বিদা ইয়া শাহরু রমাদান—বিদায় বিদায় হে রমাদান মাস।
অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বে দুটি বড়ো আনন্দের উত্সব গভীর উত্সাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়, যার একটির নাম ঈদুল ফিতর, অন্যটির নাম ঈদুল আযহা। ঈদুল ফিতর হচ্ছে সিয়াম ভাঙার আনন্দ-উত্সব এবং ঈদুল আযহা হচ্ছে কোরবানির আনন্দ-উত্সব। এ দুই ঈদেরই গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আনন্দ-বৈভবের নিরিখে ঈদুল ফিতর সবচেয়ে বড়ো উত্সব। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ-উত্সব আছে। আমাদের আনন্দ-উত্সব এই ঈদ। প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে মক্কা মুয়াজ্জামাহতে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করে এসে এখানে স্থাপন করলেন একটি মসজিদ এবং এই মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে তুললেন একটি সুখী-সুন্দর সমাজকাঠামো।
বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আনাস রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন যে তাদের দুটি উত্সবের দিন রয়েছে। সেই দুই দিন তারা আমোদ-ফুর্তি-খেলাধুলা প্রভৃতি করত। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—এই দুই দিন কীসের জন্য? তারা বলল, এই দুই দিন অন্ধকার যুগে আমরা খেলাধুলা করতাম। এই কথা শুনে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ এই দুই দিনের পরিবর্তে অধিকতর উত্তম দুটি দিন তোমাদের দিয়েছেন, আর তা হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ।
জানা যায়, ইসলাম-পূর্ব যুগে যে দুটি আনন্দ-উত্সব পালিত হতো, তার একটির নাম ছিল নওরোজ, অন্যটির নাম ছিল মেহেরজান। তদানীন্তন পারস্যে এ দুটি উত্সবের ব্যাপক প্রভাব ছিল।
৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ শাবান রমাদান মাসে সিয়াম পালন করার বিধান নাযিল হয়। এরই ১৪-১৫ দিন পর মাহে রমাদানুল মুবারকের আগমন হলে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত উত্সাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে রমাদানের সিয়াম পালন করেন। যে বছর প্রথম রমাদানের সিয়াম পালিত হয় সেই বছরের সেই রমাদানেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ গাযওয়ায়ে বদর। সেই রমাদান শেষেই সর্বপ্রথম মুসলমানদের নিজস্ব আনন্দ-উত্সব ঈদুল ফিতর পালিত হয় মদিনা মনওয়ারায়। ঈদুল ফিতরের সঙ্গে বিজয়ের যেন এক মহা যোগসূত্র রয়েছে।
ঈদুল ফিতরকে দানের আনন্দ উত্সবও বলা হয়। ঈদুল ফিতরের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হচ্ছে দরিদ্রদেরকে সাহায্য করা। বিত্তবানদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে বিত্তহীনদের মধ্যে ফিতরা বিতরণ করা। ঈদের দিন সকালেই ঈদের নামায আদায় করতে যাওয়ার আগেই ফিতরা প্রদান করা উত্তম। প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, ফিতরা সিয়ামকে কুকথা ও বাহুল্যবাক্য থেকে পবিত্র করে এবং গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের আহার্য জোগায়। তিনি আরো বলেছেন : ফিতরা যারা দেয় তোমাদের সেসব ধনীকে আল্লাহ তাআলা পবিত্র করবেন এবং তোমাদের মধ্যে যারা দরিদ্রদেরকে দান করে আল্লাহ তাদেরকে তার চেয়ে অনেক বেশি দান করবেন। ঈদ পরিচ্ছন্ন আনন্দের দিন। করোনাকালে আমরা সতর্ক হয়ে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবার ঈদ উদ্যাপন করব।
lলেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ