কৃষিশ্রমিক ও যান্ত্রিকীকরণ

বেশ কিছু বছর ধরে কৃষি অলাভজনক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যে কারণে কৃষিতে অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। পুরুষেরা গার্মেন্টস, রিকশাচালক, আটোচালক বা ছোটোখাটো ব্যবসায় নিয়োজিত হচ্ছে, গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছে। আর এ কারণেই কৃষি টিকিয়ে রাখতে নারী শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছে অধিক মাত্রায়। ২০১৮ সালে কৃষিতে মোট কর্মসংস্থানের ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়োজিত ছিল যার মধ্যে পুরুষ ৫৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং নারী ৪৫ দশমিক ০৭ শতাংশ। কৃষির অন্যান্য কাজে নারীরা ব্যাপক অংশগ্রহণ করলেও সামাজিক কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা ধান লাগাতে ও কাটতে মাঠে যায় না। ফলে ধান কাটা মৌসুমে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে।

ধান কাটা মৌসুমে শ্রমিক সংকট কয়েক বছর ধরেই বাড়ছিল। এই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, অটোচালক, করোনা মহামারির কারণে গ্রামে অবস্থান করছিল, তাছাড়া প্রকৃতিও অনুকূলে ছিল, পার্শ্ববর্তী এলাকা ও শহর থেকে যাওয়া শ্রমিক আনা গিয়েছিল, তাই হাওর এলাকার সমস্যা সমাধান করা গেছে। এখনো অন্যান্য অঞ্চলে মোট উত্পাদনের ৬০ শতাংশ মাঠে আছে, যা ঘরে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে জুন মাস লেগে যেতে পারে।

এক্ষেত্রে কৃষি শ্রমিক ঘাটতি সমাধান ও যান্ত্রিকীকরণ বিষয়ক আমাদের ভাবনাগুলো হলো—

১।             কর্মে নিয়োজিত জনসংখ্যার ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে কর্মরত ফলে পূর্ণ যান্ত্রিকীকরণ করা যাবে না। কতটুকু খামার যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিক প্রাপ্যতা কেমন, দুটির সমন্বয় করে কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে যাতে কৃষি শ্রমিক ও যান্ত্রিকীকরণের দুটির-ই ভারসাম্য রক্ষা হয়। কৃষি থেকে অকৃষিতে অনেক পরিযায়ী হয়েছে। ভবিষ্যতে কী পরিমাণ পরিযায়ী হবে সেটার সঠিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

২।             ফসল কাটার জন্য কম্বাইন্ড হারভেস্টারের পাশাপাশি মিনি কম্বাইন্ড হারভেস্টারের কথা ভাবা যেতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ৭০ হর্স পাওয়ার কম্বাইন্ড হারভেস্টার প্রতি ঘণ্টায় শুণ্য দশমিক ৮২ থেকে

                ১ দশমিক ১২ একর ধান কাটা, মাড়াইসহ বস্তাবন্দি করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতি একরের ধান কাটতে ৯ লিটার ডিজেল লাগবে, ৭০ শতাংশ শ্রমিক কম লাগবে এবং সনাতন পদ্ধতির চেয়ে খরচ বাঁচবে প্রায় ৬১ শতাংশ। তাছাড়া সনাতন পদ্ধতিতে যে পরিমাণ ধানের অপচয় হয় মিনি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ৪ দশমিক ৭৪ ভাগ অপচয় কম হয়। 

৩।             ধান কাটা শেষ হলে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ধান মাড়াই ও শুকানো। বর্ষাকাল চলে আসে বিধায় রোদ পাওয়া দুঃসাধ্য। কখনো কখনো ধান শুকাতে তিন-চার দিন রোদের প্রয়োজন হয়। তাই ধান কাটার পাশাপাশি ধান শুকানোর জন্য বিএইউ-এসটিআর ড্রায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। যা দামে তুলনামূলক সাশ্রয়ী (৭০ হাজার টাকা), শুণ্য দশমিক ৫ টন ধান শুকাতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে, নারীরা স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারে এবং সর্বোপরি দুই-তিন শতাংশ অপচয়ও রোধ করা যায়। 

৪।             কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ২০১০ সালের পর ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। যান্ত্রিকীকরণ কৃষি উত্পাদন পর্যায়ে সীমিত। পোস্ট-হারভেস্ট, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে যন্ত্রপাতির ব্যবহারের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।  

৫।             কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপারের সঠিক ব্যবহার নিয়ে ভাবতে হবে। ২০ লাখ টাকার হারভেস্টার ভর্তুকি বাদ দিয়ে ৬ লাখ টাকা দিয়ে কেনার সাধ্য বড়ো কৃষক বা ধনী ব্যক্তি ব্যতীত অন্যদের সাধ্যের বাইরে। প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা ফি প্রদান সাপেক্ষে সেবা কিনে থাকে। মালিকরা যাতে একচেটিয়া সেবা ফি নির্ধারণ করতে না পারে এ ব্যাপারে মেশিন মালিক ও কৃষকদের মধ্যে অধিদপ্তর রেফারির ভূমিকা পালন করতে পারে। 

৬।             খামারের আকারবান্ধব কৃষি যন্ত্রপাতির উত্পাদন ও তার সার্ভিস সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। বড়ো আকারের যন্ত্রপাতি ক্ষুদ্র আকারের উঁচু-নিচু জমিতে ব্যবহার অনুপযোগী। সরকারি নীতি সহায়তা (যেমন কর ছাড়) প্রদান করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের উদোক্তা তৈরি করা গেলে অনেক কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।

৭।             দেশে উত্পাদিত কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন নিড়ানি, থ্রেসার, স্প্রেয়ার ইত্যাদির উত্পাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য নীতি সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে স্কেলবান্ধব ও সাশ্রয়ী কৃষি যন্ত্রপাতি উত্পাদনের বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

৮।             কৃষি উদ্যোক্তারা সরকারের ঘোষিত ৪ শতাংশ হার সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ঋণ নিতে পারবে। এক্ষেত্রে যাতে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও প্রকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির উত্পাদন, মেরামত ও সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তারা ঋণ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।