করোনা: স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে মসজিদে ঈদ জামাত

করোনার কারণে ভিন্ন আঙ্গিকে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। চলমান করোনা সংকট মোকাবেলায় সচেতনতার অংশ হিসেবে সরকারি নির্দেশনায় ঈদগাহ এর পরিবর্তে দেশের বিভিন্নস্থানে মসজিদে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সচেতনতার অংশ হিসেবে সকাল থেকেই মসজিদগুলোতে চলে জীবানুণাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। সেই সঙ্গে মসজিদে প্রবেশের সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হয়।

এদিকে নামাজ শেষে সারিবদ্ধভাবে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুসল্লিরা একে অপরের সঙ্গে মুখে কুশলাদি বিনিময় করলেও যুগযুগ ধরে চলে আসা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কোলাকুলি কেউ করেননি। এরআগে করোনা থেকে মুক্তিসহ দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাতে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বরিশাল: সামাজিক দুরত্ব মেনে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে এবার বরিশালে প্রধান ঈদ জামাতের কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। শারীরিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্য বিধি প্রতিপালনের জন্য এবার মসজিদের ভেতরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঈদ জামাত। মসজিদগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাধিক ঈদ জামাত। বরিশালে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ফজরের নামাজের পরপরই সকাল পৌঁনে ৬টায় সদর উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদে। সকাল ৮টায় কালেক্টরেট মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা এবং অনেক মুসল্লিরা এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

নামাজ শেষে বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ মসজিদে জামাতের সহিত ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরেছে। এ জন্য মহান সৃষ্টি কর্তার কাছে শুকরিয়া প্রকাশ করেন তিনি। করোনা বাস্তবাতার কারণে এবার ঈদের জামাতে শারীরিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের উপর গুরুত্বারোপ করার কথা বলেন তিনি। করোনা এড়াতে সবাইকে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।


 
জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, খুশির ঈদ। ৩০টি রোজার পর আনন্দের সাথে সামাজিকভাবে যেভাবে ঈদ উদযাপনের কথা, সেটা এবার করোনার কারণে হয়নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা মেনে ঈদের জামাত আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিধির কারণে ঈদগাহ কিংবা খোলা মাঠের পরিবর্তে মসজিদে ঈদের জামাত আদায় করা হয়েছে। এ কারণে একাধিক জামাতের ব্যবস্থা রাখা হয়। ঈদের উৎসব সারা বছর পালন করার জন্য নিজে, পরিবার ও সমাজকে করোনা মুক্ত রাখতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।

এছাড়াও নগরীর চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী জামে এবাদুল্লাহ মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। নগরী এবং জেলার মসজিদগুলোতে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ঈদ জামাতের ব্যবস্থা রাখা হয়। প্রতিটি মসজিদে বেশিরভাগ মুসল্লি জায়নামাজ নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। তাদের মুখমণ্ডলে ছিলো মাস্ক, অনেকের হাতে ছিলো গ্লোভস। এছাড়া অনেক মসজিদে ডিজইনফেক্টেন্ট চেম্বার, ব্লিচিং পাউডারযুক্ত পাপোস এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখা হয়। এদিকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরে খুশি সাধারণ মুসল্লিরা। ঈদের নামাজের মোনাজাতের মধ্য দিয়ে করোনা নির্মূল হবে আশা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। 

খুলনা: করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে এবার সারা দেশের মতো বিভাগীয় ও শিল্প নগরী খুলনায় এক ভিন্ন আঙ্গিকে ঈদুল-ফিতর উদযাপিত  হয়েছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সোমবার সকাল ৮টায় খুলনা টাউন জামে মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাতে ইমামতি করেন টাউন জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ সালেহ। এছাড়া কোর্ট জামে মসজিদে সকাল সাড়ে ৮টায় একটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

ঈদের প্রধান জামাতে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ড. মুঃ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন, প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করেন। নামাজ শেষে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি, দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

টাউন জামে মসজিদে দ্বিতীয় জামাত সকাল ৯টায় এবং তৃতীয় ও শেষ জামাত সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন মসজিদে সিটি কর্পোরেশনের সহায়তায় ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের তত্ত্বাবধানে পৃথকভাবে নিজেদের সময় অনুযায়ী ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া জেলার সকল মসজিদে ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, খুলনা বিশেষ অনুষ্ঠানমালা এবং স্থানীয় সংবাদপত্রসমূহ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। বিভিন্ন হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশুসদন, ভবঘুরে কল্যাণকেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণকেন্দ্রে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়।

বাগেরহাট: স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন মুসল্লিরা। সকাল সাড়ে সাতটায় বাগেরহাটের বিশ^ ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এই মসজিদের বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিদের জন্য কর্তৃপক্ষ মসজিদের প্রবেশ পথে হাত ধোঁয়ার জন্য সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখে। মুসল্লিরা মুখে মাক্স পরে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

মুসল্লিরা বলেন, এবারের ঈদে মনে আনন্দ নেই। নামাজ পড়তে হবে তাই পড়া, দেশে যেভাবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে তা থেকে যেন সবাই আমরা মুক্তি পেতে পারি নামাজ পড়ে সেই দোয়াই করলাম মহান আল্লাহর কাছে।

নামাজ আদায় শেষে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুসল্লিরা যেন নামাজ আদায় করতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ষাটগম্বুজ মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসা সব মুসল্লি সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন। জেলার সকল মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা যেন নামাজ আদায় করেন সেজন্য মসজিদ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ইমামদের পরামর্শ দেয়া হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: চলমান করোনা সংকট মোকাবেলায় সচেতনতার অংশ হিসেবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খোলা মাঠের পরিবর্তে মসজিদ মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে মসজিদগুলোতে সামাজিক দুরুত্ব মেনে একাধিক জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। সকাল ৭টা, পৌনে ৮টা ও সাড়ে ৮টায় জেলা জামে মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা প্রশাসক হায়াশ উদ দৌলা খান, পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ অংশ নেয়। এছাড়া জেলার ৪ হাজারেরও বেশি মসিজদে একাধিক জামাতের মাধ্যমে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

ঝিনাইদহ: প্রথম ঈদগাহ এর পরিবর্তে মসজিদে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে মসজিদগুলোতে আলোক সজ্জা ও রঙ্গিন কাগজ দিয়ে সাজানো হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুসল্লিরা মসজিদের ভিতর ঈদের নামাজ পড়েন। জেলায় দুই হাজার ৯শ মসজিদে ঈদের জামাত হয়েছে। মানুষ সুবিধা মত মসজিদে নামাজ পড়েছেন। নামাজ শেষে কোলাকুলি করতে দেখা যায়নি।

জয়পুরহাট: ঈদের জামাত মসজিদে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। জয়পুরহাট কেন্দ্রিয় মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৮টায়। এখানে ইমামতি করবেন জয়পুরহাট সিদ্দিকীয় মডেল কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মওলানা আব্দুল মতিন। পুলিশ লাইন মসজিদে সকাল ৯টায়, রাসদের বাজলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন জমিয়তে আহলে হাদিস মসজিদে সকাল সাড়ে ৭টায়, পর্ব বাজার জামে মসজিদে সকাল সাড়ে ৮টায়, নতুনহাট বায়তুন মামুর মসজিদেও এবার সকাল ৭টায় প্রথম জামাত এবং পরে একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর): সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঐতিহাসিক বড় মসজিদে ঈদুল ফিতরের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ৬টায়। প্রথম জামাতে ইমামতি করেন হাফেজ মহিউদ্দিন আল মামুন। দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মুফতি আবদুর রউফ। তৃতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ১০টায়। এতে ইমামতি করে মুফতি আবু ছাঈদ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মাইকিং করে নির্দেশ প্রদান করা হয়। আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের হাতে জীবানুনাশক পানি স্প্রে করে মসজিদে প্রবেশ করানো হয়েছে।

আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি (ভারপ্রাপ্ত) প্রিন্স শাকিল আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ধর্মমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে আমাদের মসজিদে ঈদুল ফিতরের ৩টি জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ্যাস্টেটের পক্ষ থেকে মসজিদে আগত মুসল্লিদের জন্য অজু খানায় সাবান ও মসজিদে ডুকার পূর্বে জীবানুনাশক স্প্রে করা হয়েছে। ফজর নামাজের পর পর স্যাভলন মিশ্রিত পানি দিয়ে মসজিদ পরিষ্কার করা হয়েছে।

রামগতি (লক্ষ্মীপুর): রামগতিতে মসজিদে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে মসজিদগুলোতে সামাজিক দুরুত্ব মেনে একাধিক জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। সকাল সাড়ে ৮টা ও ৯টায় উপজেলা পরিষদের জামে মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল মোমিন, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ অংশ নেয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল মোমিন বলেন, সরকারি নির্দশনা অনুযায়ী উপজেলার ৩৫০টি মসিজদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে একাধিক জামাতের মাধ্যমে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

ইত্তেফাক/আরকেজি