বিনা চিকিৎসায় কলেজছাত্রের মৃত্যুর পর ডেথ সার্টিফিকেট পেতে ৫শ’ টাকা

‘অল্প কিছুক্ষণ আগে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টায় সময় মাত্র কুড়ি বছরের টগবগে তরুণ ভাগিনা সামির আহমেদকে কবর দিয়ে এলাম। তার আগে বেদনাকাতর হৃদয় নিয়েই অকালে চির বিদায় নেয়া আমার বোনের ছেলের মৃত্যুর ঘটনাটি সবাইকে জানানো প্রয়োজন বোধ করছি।’ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের সামনে দুই মোটরসাইকেলে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী সামির আহমেদের মামা লিটন মাহমুদ তার ফেসবুকে নিহত ভাগিনাকে নিয়ে এই কথা বলেছেন। 

অভিযোগ করা হয়েছে, ডিবি অফিসের সামনে থেকে আহত অবস্থায় সামির আহমেদকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরলেও একজন চিকিৎসক বা একজন নার্স তার রক্তাক্ত শরীর ছুঁয়ে দেখেননি। রক্তাক্ত শরীরের সামিরের বাঁচার আকুতির সময় লাথি দিচ্ছিলেন স্ট্রেচারে। এতে শব্দ থেকে বাঁচার জন্য একজন নার্স সামিরের দুই পা স্ট্রেচারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয়। এর এক ঘণ্টা পর সামির স্ট্রেচারে মারা যায়। 

বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টার দিকের ঘটনার বরাত দিয়ে রমনা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, সামির কেরাণীগঞ্জ কদমতলী এলাকার বাসিন্দা। ঢাকায় আইডিয়াল কলেজের একাদল শ্রেণির কমার্স বিভাগের শিক্ষার্থী। কদমতলীর বাসা থেকে সামির মোটরসাইকেলে কলেজের ক্লাশ করে। করোনার লকডাউনে সে এই দুই মাস গৃহবন্দী ছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় আসার জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। বিকাল ৩ টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের সামনে দুই মোটরসাইকেলে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সামির ছিল একটি মোটরসাইকেলে। অপর মোটরসাইকেলের চালক ছিল ১৫ বছর বয়সের ইফসুফ। ইউসুফের বাসা মালিবাগে। ইফসুফের মোটরসাইকেলের আরোহী ছিল আলিফ (১৭) নামে আরেক বন্ধু। ঘটনাস্থলে ইফসুফ নিহত হয়। সামির ও আলিফকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। 

নিহত সামিরের মামা লিটন মাহমুদ বলেন, আহত অবস্থায় পুলিশ সামিরকে ঢাকা মেডিকেলে আনার পর কেউ তাকে চিকিৎসা দেয়নি। এমনকি তার স্ট্রেচার কেউ ধরেনি। একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক সামিরের চিৎকারে সারা দিয়ে তিনি ছুটে আসেন। ওই অ্যাম্বুলেন্স চালক সামিরের স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে হাসপাতালের নিচতলায় কয়েকটি ওয়ার্ডে নিয়ে যান। কিন্তু কোনো চিকিৎসক বা নার্স সামিরকে কোনো চিকিৎসা দেননি। 

ফেসবুকে সামিরের মামা লিটন মাহমুদ লিখেছেন, ‘করোনাকালে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটা ভয়ানক খারাপ তা হয়তো বুঝতেই পারতাম না। যদি না, আমার আপনজনের জীবনে এমন দূর্ঘটনা ঘটতো? এক্সিডেন্টের পর পুলিশ ভাগিনাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। এরপর প্রায় ১ ঘণ্টা কোন চিকিৎসা হয়নি। ওই সময় আমাদের সদাহাস্যজ্বল ভাগিনা ট্রলিতে শুয়ে ছটফট করছিল, কাতরা ছিল ( মুরগি জবাই করার পর যেমন করে তেমনিভাবে মৃত্যুর  শেষ যন্ত্রণা থেকে বাঁচা জন্য লড়াই করছিল)। ওই সময় কোন একজন নার্স বা ওয়ার্ড বয় ট্রলির সাথে তার (সামির) দু’পা বেঁধে দেয়। এরপরও মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করতে থাকে সামিরের দেহখানি। শেষ পর্যন্ত কোন চিকিৎসা না পেয়ে আমার অমন তরুণ ছ’ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা ৪০ ইঞ্চি চওড়া ছাতির ভাগিনাটি মৃত্যুর কাছে হেরে যায়।’ 

ফেসবুকে লিটন মাহমুদ আরো লিখেছেন, ‘এখানেই শেষ নয়! প্রিয়জন হারানো এই ব্যাথার মাঝেও মরদেহ বুঝে নিতে সামনে আসে একের পর এক আইন-কানুন, নিয়ম নীতি। এতো সব ঝামেলা  শেষ করে মরদেহ বুঝে নিতে ডেথ সার্টিফিকেট নিতেও দিতে হলো পাঁচশত টাকা। দোয়া করি করোনাকালের এই পরিস্থিতির মধ্যে এমন দুর্যোগ যেন কারো পরিবারে না আসে।’

ইত্তেফাক/কেকে