‘ছাদের বাড়ি লাগবেনা, তুই ফিরে আয় বাজান’

‘আমাগের আর ছাদের বাড়ি লাগবে না। সংসারির সুখ লাগবে না। তুই ফিরে আয় বাজান, ফিরে আয়’ লিবিয়ায় নিহত রাকিবুলের মা মাহেরুন নেছার এমন বুকফাটা আর্তনাদে শোকে বিহ্বল খাটবাড়িয়া গ্রাম। আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে অবিরাম কেঁদে চলেছেন মাহেরুন নেছা।

মাত্র সাড়ে তিনমাস আগে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের ইসরাইল হোসেনের ছেলে রাকিবুল ইসলাম রাকিব (২০) লিবিয়ায় যান। একটু স্বচ্ছল জীবনযাপনের জন্যে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। সম্পত্তি বিক্রি আর জমানো টাকা খরচ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন ইসরাইল হোসেন। ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পাশাপাশি পরিবারের স্বচ্ছলতার কথা ভেবেই লেখাপড়ার পাট শেষ না করেই তাকে বিদেশ পাঠানো হয়। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ তো দূরের কথা; সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ রাকিবুলের বাবা ইসরাইল ও মা মাহেরুন নেছা।

পরিবারের অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে রাকিবুলকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। দালালচক্র লিবিয়ার একটি শহরে ছেলে রাকিবকে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুঠোফোনে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের লোকজন টাকা দিতে রাজিও হন। কিন্তু এরই মধ্যে খবর এলো দালাল চক্র রাকিবুলকে গুলি করে হত্যা করেছে।

গৃহযুদ্ধকবলিত লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে বৃহস্পতিবার ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করে পাচারকারী চক্র। এদেরই একজন যশোরের ঝিকরগাছার সন্তান রাকিবুল।

আরও পড়ুন: চোখের সামনেই হারিয়ে যেতে বসেছে নওয়াব বাড়িটি

রাকিবুলের বড়ভাই সোহেল রানা বলেন, শুরু থেকেই দালালেরা তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকে। তাকে আটকে রেখে ১৭ মে  ফোনে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ওই টাকা দুবাই থেকে তারা নিতে চায়। ভাইয়ের মুক্তির জন্য ওই টাকা দিতে রাজিও হয়েছিলেন তারা। আগামী ১ জুন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলেন না। তার চাচাতো ভাই শুক্রবার লিবিয়া থেকে ফোন করে জানিয়েছেন, যে ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তার মধ্যে রাকিবুলও রয়েছে। সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।’

রাকিবুলের বাবা ইসরাইল হোসেন জানান, রাকিবুল যশোর সরকারি সিটি কলেজে অর্থনীতিতে অনার্সে ভর্তি হয়েছিল। রাকিবুলের চাচাতো ভাই ফিরোজ হোসেন লিবিয়া প্রবাসী। ওই ভাই লিবিয়ায় থাকা বাংলাদেশি দালাল আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে রাকিবুলকে লিবিয়ায় নিয়ে যান। সাড়ে তিন মাস আগে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে রাকিবুলকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। চাচাতো ভাই ফিরোজ হোসেনের মাধ্যমে লিবিয়ার দালাল আব্দুল্লাহর সহযোগিতায় প্রথমে ভারত থেকে দুবাই; এরপর মিশর হয়ে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে পৌঁছায় রাকিবুল। সেখান থেকে লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে জিম্মি হওয়ার পর মানব পাচারকারীদদের গুলিতে রাকিব নিহত হয়।

ইসরাইল হোসেন আরও বলেন, বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, ভিটেবাড়ি বিক্রি করে রাকিবের মুক্তিপণের টাকা জোগাড়ের চেষ্টা চলছিল। আগামী ১ জুন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে পাচারকারীরা তাদের সবকিছু শেষ করে দিলো। এখন সরকারের কাছে তাদের আবেদন, সন্তানের লাশ বাড়ি আনতে চাই।

যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম জানান, নিহত রাকিবের মরদেহ দেশে আনার ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।

ইত্তেফাক/এসি