রোগীর সেবা ও মানবকল্যাণে ইসলাম

ই সলাম মানবতার ধর্ম। মানবের কল্যাণ সাধনই ইসলামের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে ইসলামের রয়েছে সার্বিক  দিকনির্দেশনা। এসব নির্দেশনার ব্যাপারে মুসলিমরা আজ আত্মবিস্মৃত এবং মানব কল্যাণ সাধনে পশ্চাত্পদ। আর অমুসলিমরা এটাকে তাদের ধর্ম প্রচারের একমাত্র মাধ্যম বানিয়েছে। অথচ প্রকৃতির দাবি অনুযায়ী মানবকল্যাণ সাধনে মুসলিমরা হবে অগ্রগামী। কেননা ইসলামি জীবনদর্শন মানবতার কল্যাণসাধনে মুসলিমদেরকে সবচেয়ে বেশি উত্সাহ, অনুপ্রেরণা ও তাগিদ প্রদান করেছে।

ইসলাম সার্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানবতার কল্যাণ সাধনে ইসলামি বিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ও জ্ঞান খুবই অপ্রতুল। প্রিয় নবি (স) ইমান ও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন মাত্র ২৩ বছর। আর মানবতার কল্যাণে কাজ করেছেন গোটা জীবন। সুতরাং মুসলিমদের জীবনে প্রাত্যহিক ইবাদত-বন্দেগি যেমনি আবশ্যক, মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা এর চেয়ে আরো বেশি জরুরি। চিকিত্সা একটি মৌলিক ও মানবিক অধিকার। আর এ অধিকার আদায়ে ইসলাম সদা বদ্ধপরিকর।

সুস্থতা মহান আল্লাহ প্রদত্ত অনেক বড়ো নিয়ামাত। আল্লাহর ইবাদাত যথাযথ পালনে এর বিকল্প নেই। এটিকে গনিমাত মনে করে কাজে লাগাতে পারলে মানবজীবন সফলতায় পর্যবসিত হবে। কিন্তু খাদ্যাভ্যাস, জীবন পরিচালনা পদ্ধতি, মানসিক যাতনার কারণে আল্লাহর দেওয়া সুস্থ-সবল দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেজন্য তিনি আরোগ্যের ব্যবস্থাও দিয়েছেন। ‘তিনি এমন কোনো রোগ পাঠাননি যার আরোগ্যের ব্যবস্থা দেননি।’ (বুখারি : ৫৬৭৮)

সৃষ্টিগত দিক থেকে প্রত্যেক মানব একই উত্স থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সবার আদি পিতা আদম ও আদি মাতা হাওয়া (আ.)। ফলে একে অন্যের কল্যাণ কামনা করাই প্রকৃতির দাবি। তাই সমাজের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক  হলো—একটি পরিবারের ন্যায়। নবিজির ভাষায়, ‘সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবার। কাজেই সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর পরিবারভুক্তদের প্রতি অনুগ্রহ করে’। (মিশকাত : ৪৯৯৮)।

ইসলামে রোগীর সেবায় এগিয়ে যাওয়া ঐচ্ছিক হিসেবে নয়; বরং অধিকার ও কর্তব্যের পর্যায়ে রয়েছে। এটি মুসলিমদের পারস্পরিক অধিকারের অন্যতম। রসুল (স) বলেন, ‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের ছয়টি হক রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো, যখন সে অসুস্থ হবে তাকে শুশ্রূষা করা।’ (মুসলিম :৫৭৭৮)। শুধু তাই নয়; ইসলাম অসুস্থ বা রোগীর চিকিত্সা ও সেবাযত্ন করার নির্দেশ প্রদান করেছে। হাদিসে এসেছে, ‘অসুস্থ লোকের সেবা করো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করো।’ (বুখারি : ৫৬৪৯)। রসুল (স) নিজেও রোগীর যত্ন নিয়েছেন। তিনি যখন কারও অসুস্থতার সংবাদ পেতেন, তখন তার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য তার বাড়িতে গমন করতেন। রোগীর কপালে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দিতেন এবং তার জন্য দোয়া করতেন। তিনি রোগীর পছন্দের খাবার সম্পর্কে জিগ্যেস করতেন এবং তা সরবরাহের চেষ্টা করতেন। জাবির (রা.) বলেন, একবার আমি ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে রসুল (স) আমার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আমার কাছে এলেন। তিনি আমাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পেলেন। তারপর অজু করলেন এবং আমার শরীরে অজুর পানি ছিটিয়ে দিলেন। ফলে আমি সংজ্ঞাপ্রাপ্ত হই। (বুখারি : ৫২৭৪)।

এতদ্ব্যতীত হাদিসে কুদসিতে রসুল (স) বলেন, ‘কেয়ামত দিবসে নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করোনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক, আপনি তো বিশ্বপালনকর্তা কীভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব? তিনি বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কি জানো না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে...।’ (মুসলিম : ৬৭২১)।

অতএব, মানবের কষ্ট লাঘব করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। আর কিয়ামতের কঠিন দিবসে যা মুক্তি লাভের নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন...।’ (মুসলিম : ৭০২৮)।

রোগীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রে রসুল (স) ধনী-গরিব, মুসলিম-অমুসলিম, আত্মীয়-অনাত্মীয়দের কোনো বাছবিচার করেননি। মদিনায় বসবাসকারী এক ইয়াহুদির কিশোর ছেলের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি তার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য তাদের বাড়িতে গমন করেন। তাছাড়া মদিনাবাসীর চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। মহানবি (স)-এর এসব তত্পরতা প্রমাণ করে যে, সব মানুষের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করা ইসলামি জীবনবিধানের মৌলিক অংশ।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া