মহামারি করোনা ভাইরাসের ছোবলে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র। সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র সবার থেকে এগিয়ে। এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ২১ লাখের বেশি এবং মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষের। দ্বিতীয় দফায় দেশটিতে সংক্রমণ ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
করোনার ব্যাপক বিস্তার ও প্রাণহানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অনেকেই ক্ষুব্ধ। অনেকে বলছেন, করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আগে থেকেই প্রশাসনকে অবহিত করা হলেও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। উপরন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তিমূলক কথা বলেছেন। করোনা মোকাবিলায় ও এর চিকিত্সায় বিজ্ঞানবহির্ভূত প্রস্তাব ও পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে অনেক মার্কিনি তিক্ত-বিরক্ত। অনেকের দাবি, এই কঠিন সময়ে যথাযথ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
করোনা সংকটের মধ্যেই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়েপোলিস শহরে পুলিশ হেফাজতে নিহত হন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড। এই হত্যার ভিডিও প্রকাশের পর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ও ন্যায়বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ৭০টির বেশি শহরে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভে ১২ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ বিক্ষোভ চলাকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে পরিস্থিতি আরো জটিল হয় বলে অনেকে মনে করেন। শিকাগোর এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, গঠনমূলক কিছু বলার না থাকলে চুপ থাকুন। আপনি অল্প বয়সি মার্কিনিদের ঝুঁকিতে ফেলছেন। ব্যাক লাইভস ম্যাটার বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছেন দেশটির বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। ট্রাম্পের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমার জীবদ্দশায় এমন প্রেসিডেন্ট দেখিনি, যিনি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেননি। এমনকি তিনি কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করেননি।
এ পরিস্থিতি যখন বিরাজ করছে তখন আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে প্রায় সাড়ে চার মাস বাকি। নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হতে লড়বেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মূল প্রতিদ্বন্দ্ব্বী হচ্ছেন ডেমোক্র্যাট দলের জো বাইডেন। যিনি সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। করোনা সংকটের কারণে জনসম্মুখে বড়ো প্রচারণায় নামতে না পারলেও এরই মধ্যে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন দুই প্রার্থী। অন্যদিকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপ কার্যক্রমও।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপের ফলে দেখা গেছে, করোনা সংকট, বিপর্যস্ত অর্থনীতি আর বর্ণবাদী বিক্ষোভ-সংঘাতের এই সময়ে স্পষ্ট ব্যবধানে বাইডেনের থেকে পিছিয়ে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সম্প্রতি সিএনএনের জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন আগের চেয়ে ৭ পয়েন্ট কমেছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্ব্বী জো বাইডেনের প্রতি সমর্থন অতীতের যে কোনো সময়ের থেকে সর্বোচ্চ বেড়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মার্কিনি মনে করেন এখন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ একটি বড়ো সমস্যা। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গদের থেকে শ্বেতাঙ্গরাই বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। প্রতি ১০ জন মার্কিনির আট জনের বেশি মনে করেন জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর চলমান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ-প্রতিবাদ খুবই ন্যায়সঙ্গত। তারা মনে করেন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যের মতো বর্ণবাদ এখন বড়ো নির্বাচন ইস্যু।
সিএনএনের জরিপে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে কাজ করছেন তাতে ৩৮ শতাংশ মার্কিনির সমর্থন আছে। অনুমোদন নেই ৫৭ শতাংশ মার্কিনির। অন্যদিকে হোয়াইট হাউজের দৌড়ে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ১৪ পয়েন্টে বাইডেনের থেকে পিছিয়ে আছেন ট্রাম্প।
সিএনএনের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি নারী ভোটারদের ভোট পেতে চলেছেন জো বাইডেন। নিবন্ধিত নারী ভোটারদের ৫৯ শতাংশ বাইডেনকে ভোট দিতে চান। এই পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে বিপদ শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একা দেখছেন না, বরং আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন রিপাবলিকান পার্টির নেতারাও। সিএনএনের এক খবরে বলা হয়েছে, তিন মাস আগেও ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন রিপাবলিকানরা। কিন্তু এখন সে অবস্থা পালটে গেছে। রিপাবলিকান স্ট্র্যাটেজিস্টরা উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু হারতে যাচ্ছেন না বরং রিপাবলিকানদেরও ডুবাতে যাচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে সিনেটও তাদের হাতছাড়া হতে পারে। রিপাবলিকান কিছু কর্মী বলছেন, করোনা মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা ও অর্থনীতির ধস বড়ো ক্ষতি করেছে। এই অবস্থায় আগামী নির্বাচনে সিনেটের ২৩টি আসন ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যারিজোনা ও নর্থ ক্যারোলিনার মতো অঙ্গরাজ্যে সহজ জয় আশা করা হচ্ছিল, সেখানে এখন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বর্তমান অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জয় নিয়ে বড়ো শঙ্কা ভর করছে। তবে নির্বাচনের এখনো চার মাসের বেশি সময় বাকি। এর মধ্যে পরিস্থিতি কতটা বদলায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।