গত মার্চের এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে গ্রিন রোডের বাসায় তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। গিয়েছিলাম প্রাণের টানে—কালজয়ী দেশের গান ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো—এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো’ এবং শ্রোতা-নন্দিত এ ধরনের আরো কিছু গান জন্ম নেবার গুম হয়ে থাকা ইতিহাস জানতে।
প্রায় দুই সপ্তাহকালব্যাপী ফোনালাপের মধ্যে নির্ধারিত হয়েছিল পরম প্রত্যাশিত সেই সাক্ষাতের সময়টি। তিনি কথা বলতে উদগ্রীব ছিলেন যদিও দারুণ ব্যস্ততা ছিল ‘বাংলা খেয়াল’-এর প্রকাশনা নিয়ে। বলেওছিলেন সে কথা। আরো বলেছিলেন, ইদানীং শারীরিক অসুস্থতায় কষ্টকর দিনযাপনের অসুখী বৃত্তান্ত।
কে জানতো—ওটাই হবে তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা এবং সম্ভবত চেনা-জানা দুনিয়ার সঙ্গে তাঁরও অনানুষ্ঠানিক শেষ যোগাযোগ। আমার উপস্থিতিতেই তিনি শল্যচিকিত্সা নিশ্চিত করতে ল্যাব এইডে লোক পাঠিয়েছিলেন; ঠিকঠাক হয়েছিল চিকিত্সার দিনক্ষণ। পরে মৃদুসহাস্যে অনুযোগমাখা কণ্ঠে বলেছিলেন, দুনিয়ায় থাকা হলো তো অনেকদিন; শারীরিক কষ্টের জন্য স্বজনদের উদ্বেগ দেখলে মনে হয় এবার বুঝি চলে যাওয়াই ভালো।
একজন সৃষ্টিশীল মানুষের এমন আন্তরিক নিবেদনের সার্থক পরিণতি নিজের চোখেই দেখতে হলো। মানুষের জীবনে বয়স নিজেই এক মূর্তিমান অসুখ; বিশেষ করে শেষ বয়সে অন্য কোনো অসুখ পীড়িত না করলেও ‘বয়স-রোগে’ অসুস্থ থাকতে হয়। প্রয়াত কবি দিলওয়ারের ভাষায়, ‘শেষ বয়সের অসুস্থতাই আমার সুস্থতা।’ তো, প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আবির্ভূত সেই ‘সুস্থতায়’ এমনিতেই তিনি অসুস্থ ছিলেন; সঙ্গে যোগ হয়েছিল কষ্টকর শল্যচিকিত্সার গরজ। শেষতক শল্যবিদ্যার নির্দয় শরাঘাত কিছুতেই আর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি দেশবরেণ্য সুরসাধক সংগীত পিপাসুদের প্রিয়জন আজাদ রহমানের।
এর আগে, জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো... গানের ইতিহাসের খোঁজে উত্তরা ১০ নং সেক্টরে গিয়েছিলাম—গানটির গীতিকার প্রয়াত নঈম গওহর সাহেবের মেয়ের বাসায়। ক্যানসার আক্রান্ত বেগম গওহর বয়সের ভারে শ্রান্ত জড়ানো কণ্ঠে জানিয়েছিলেন তাঁর স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া গান সম্পর্কিত তথ্য। মেয়ে শ্রাবন্তি অ্যালবাম খুলে নঈম গওহরের কিছু ছবি দিয়ে বলেছিলেন গানটির সুরকার ও তাদের পারিবারিক ঘনিষ্ট সুহূদ সুরকার আজাদ রহমান সাহেবের কথা।
সেই সুবাদে গীতিকার-সুরকার সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমানকে ফোন করা এবং দেখা করতে যাওয়া। তিনি কথা বলার জন্য সময় রেখেছিলেন। কুশল বিনিময় শেষে জানতে চেয়েছিলেন—আগমনের হেতু। বলা শেষ হলে আন্তরিক হাসি ছড়িয়েছিল তার মুখে; আনমনা কণ্ঠে বলেছিলেন—এমন উদ্যোগ কেউ আরো আগে নিলে ভালো হতো। আমাদের স্বাধীনতার বয়স তো পঞ্চাশ বছর হতে চলল। অনেক গুণীজন এখন আর বেঁচে নেই, তাদের সাথে সমাধিস্থ হয়েছে অজস্র গানের দুর্লভ ইতিহাস।
সখেদে বলেছিলেন, স্বাধীনতার কালজয়ী গানগুলোর নেপথ্য ইতিহাস লিখে রাখা দরকার ছিল; ওগুলো তো হারিয়েই যাচ্ছে। কেউ হাত না বাড়ালে সেই ইতিহাস নিঃশেষিত হবে একসময়। মানুষ গান শুনবে, পেছনের ইতিহাস জানবে না। বলেছিলেন, সময় বদলাচ্ছে আর মানুষ বড়ো বেশি মেটেরিয়ালিস্টিক, যেন আবেগ-অনুভূতিহীন হচ্ছে। কিছুক্ষণ থেমে স্বস্তিতে ফিরেছিলেন একসময়; বলেছিলেন, বাংলা খেয়াল নিয়ে ব্যস্ত খুব—সময় নেই একদম। এরই মধ্যে আবার স্বাস্থ্য নিয়েও জটিলতা বাড়ছে... সময় নেই।
কথায় কথায় আগ্রহী হয়েছিলেন পরে। ইতিহাস খোঁজার উদ্দেশ্যে করা গানের তালিকাটি নিয়েছিলেন হাত বাড়িয়ে। নজর বুলিয়েছিলেন তাতে এবং আরো কিছু গানের কথা বলেছিলেন খোঁজার তালিকায় রাখতে। বলেছিলেন, সময় দিতে হবে—যেতে হতে পারে অনেক জায়গায়। শেষ মন্তব্য ছিল, এটা শেষ করা গেলে কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে সুর-সংগীতের পর্বটি সমৃদ্ধ হবে। বলেছিলেন, নিজের স্বাস্থ্য সমস্যার একটা গতি হলেই ফোন করবেন।
টেবিলের পাশে গুছিয়ে রাখা ফাইল থেকে বের করেছিলেন পত্রিকা। দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় বেশ আগে থেকে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়ে আসছিল তাঁর নিয়মিত কলাম—‘আমার জীবন আমার সংগীত’। খুঁজে পেতে একটা পাতা তুলে নিয়ে খুশি খুশি গলায় বলেছিলেন, তোমার তালিকার প্রথম গানটি দিয়েই শুরু করা যাক; জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো—জন্ম নেবার ইতিহাস ইত্তেফাকে আগেই ছাপা হয়েছে—সেটাই পড়ে শোনাবো।
দীর্ঘ লেখাটি পড়েছিলেন আন্তরিক উত্সাহ নিয়ে; তন্ময় হয়ে শুনেছিলাম। ইতিহাস তো চলে নানা বাঁকে নিজের গতিতে। আগাম জানান দেবার ধার সে ধারে না। সেকারণেই তা ইতিহাস। নইলে অসহযোগ আন্দোলনের আগে কেনই বা বঙ্গবন্ধুর সাথে শাহবাগ হোটেলের লিফটের গোড়ায় তাঁর দেখা হবে। আর কেনই বা বঙ্গবন্ধু বলবেন, আজাদ—জোরালো গান দরকার; ওই গান কোথায়? জয় বাংলা নিয়ে জোরালো গান করেন। উত্তরে তাঁর উক্তি ছিল, স্যার—আমি জোরালো গান করব।
কত ঘটনা তারপর। ইতিহাসের আহ্বানেই যেন গীতিকার-বন্ধু নঈম গওহরসহ ছুটি নিয়ে তাঁর করাচি যাওয়া; সেখানে রেডিওর পুরনো সহকর্মী ইএমআই গ্রামোফোন কোম্পানির নির্বাহী আহমেদ উল্লাহ সিদ্দিকীর সাথে দেখা এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ লতিফের বাসায় ডিনারের আমন্ত্রণ। সে রাতের ডিনার টেবিলেই এসেছিল ইএমআই’র ব্যানারে উদ্দীপনামূলক দেশের গান করার অনুরোধটিও।
সে রাতে বাসায় ফিরেই হারমোনিয়ামসহ বন্ধু নঈম গওহরকে কাগজ-কলম নিয়ে বসতে বলা; নিজের তৈরি সুরে নঈম গওহরকে দিয়ে কথা বসানো এবং পরিশেষে কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগম, সাবিনা ইয়াসমীন এবং করাচিতে অবস্থানরত শিল্পী নাসির হায়দার, জিনাত রেহানা, কাজী এহসান, রোখসানা, আসাদুল হকসহ তাঁর চাহিদামতো ব্রাস-ব্যান্ডযন্ত্রীদের বাজানো সুর মূর্ছনায় ‘পুবের ওই আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়... এবং জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’ এই কালজয়ী দুটি গানের রেকর্ডিং।
জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো... শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া যে গানটি আমরা এখন শুনে থাকি এটি মূল গান নয়, এটি অনেক পরের রেকর্ডিং। মূল গানটির রেকর্ড প্রচারের পর পরই পাকিস্তান সরকার ‘দেশের বিরুদ্ধে—দেশ ভাঙার গান’ অভিযোগে বাজেয়াপ্ত করেছিল।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেছিলেন, ঘটনা হয়েছে—অন্ধের হাতি দেখার মতো; কেউ শুঁড় দেখেছে—কান দেখেছে; ও তো সব দেখেনি; ওনারা তো রেকর্ডিয়ের সময় ছিলেন না। পরে আমারই একটা ছবির জন্যে আমার স্টুডিওতে—যেখানে আপনি এখন বসে আছেন; এখানে কিন্তু হেমন্ত এসেছেন, মান্না দে এসেছেন, গোলাম আলী এসেছেন—পৃথিবীর বিখ্যাত নানান ধরনের মানুষ এসে আমাদের মুভিটোন স্টুডিওতে ওয়ার্কশপ করেছেন, রেকর্ডিং করেছেন; সেখানেই গানটি নতুন করে রেকর্ড করা হয়েছিল সাবিনা ইয়াসমীনকে দিয়ে—আমার সংগীত পরিচালনায় একটা ছবির জন্য।
—এটা তো মুক্তিযুদ্ধের আগেই?
—হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধের আগেই; সিক্সটি নাইনে হয়েছিল।
—যেটা এখন সবিনার প্রায় একক কণ্ঠে শোনা যায়?
—না ওইটা সাবিনার কণ্ঠে পরে—অনেক পরে, অনেক পরে; আমি আপনাকে মূল গান দিয়ে দিতে পারি। বুঝতে পারছেন, এবং সত্যি কথা বলতে কি, কালেকশান রাখা উচিত—বলা উচিত—এটা বাজানোর জন্য অনুরোধ চাপানো উচিত। এখানে
যে বিষয়টা হয়েছে—নানান স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধ বিধ্বস্ত; আমার বলার আর (মৃদু হাসি) কিছু নেই। বিষয়টা...
—অসাধারণ বলেছেন, ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
—বিষয়টা হলো সত্য যে বিষয়টা—সত্য; বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখিনি; বঙ্গবন্ধু আমাদের চিনতেন না? অন্যের কথা শুনে বিশ্বাস
করবো কেন?
—যিনি ইতিহাসের সাক্ষী, তার তো অন্যের থেকে শোনার প্রয়োজন নেই।
—নো, দরকার নেই তো; তাহলে আমি বাংলায় কেন? ওটা (মূল গানটা) আমি দিতে পারতাম; আমার দুর্ভাগ্য—আমার
ছেলেটি আজকে আসেনি; আপনাকে আমি দিয়ে দেবো তো। সত্য যে বিষয়টা—সেটা চাপা পড়ে গেছে; সত্য নির্বাসিত।
সত্য নির্বাসিত এখন। এখন ষোল বছরের ছেলের কাছে শুনতে হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
—সত্যবাবু মারা গেছেন, প্রবীণ সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ সাহেব ট্রিলজি লিখেছিলেন—সত্যবাবু মারা গেছেন।
—সত্যবাবু মারা গেছেনই তো; সত্যই সত্য—সত্যবাবু মারা গেছেন। সত্য বাবু নেই। কিন্তু না, বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন
আমাদেরকে; জাত-পাতহীন একটা সমাজের কথা।
ইতোমধ্যে, আমাদের কথা বলার মাঝেই ল্যাব এইড থেকে খবর এসেছিল—নির্ধারিত ডাক্তারের সিরিয়াল পাওয়া গেছে; ক্রমিক নং ৩০—দেখবেন আজই রাত ন’টায়। ব্যস্ত কণ্ঠে বার্তাবাহককে বলেছিলেন, বেগম সাহেবাকে (সেলিনা আজাদ) জানালে উনি আরো খুশি হবেন; ও বেচারার ওপর খুব চাপ যাচ্ছে। তোমাকেও দোয়া করি, তুমি ভালো থেকো।
যেতে উদ্যত বার্তাবাহককে ডেকেছিলেন আবার, আচ্ছা শোন—আমার কিন্তু কোনো কষ্ট নেই; কিন্তু উনার (সেলিনা আজাদ) অবস্থাটা দেখলে আমার মনে হয় বিদায় নেওয়া ভালো। আর্তকণ্ঠ বার্তাবাহক মেয়েটির, ‘যাহ্—এইগুলি বইলেন না; আপনি সুস্থ হবেন—এইটার চিন্তায় এখন উনারা সবাই ব্যস্ত, আপনার বিদায় দেবার জন্য তো কেউ ব্যস্ত না; তাহলে তো কেউ চিন্তাই করতো না। আপনার ভালো হবার জন্য—রাখবার জন্যই তো সবারই চিন্তা।’
ইত্তেফাকে ১৩ মার্চ ছাপা এবং হয়তো বা জীবদ্দশায় তাঁর শেষ লেখা ‘কর মানব হওয়ার সাধনা’র প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, জীবনভর কত কিছুই তো লিখলাম; লেখালেখিটা নিজের মতো না হলে আমার মন ভরে না। ইত্তেফাকের সেই লেখার খানিকটা পড়েও শুনিয়েছিলেন শুরুর দিক থেকে—যেখানে উদ্ধৃত ছিল তাঁর একান্ত আত্মকথনগুলো। একসময় উদাস গলায় স্বগতোক্তির মতোই বলেছিলেন, আমি কোনো প্রতিদান চাই না; আমার কোনো প্রত্যাশাও নেই। ঘরে রক্ষিত মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টগুলোও ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিলেন; বলেছিলেন—এগুলো এদেশের খেটে খাওয়া মানুষদেরই অবদান। তারা আমার সৃষ্টি পছন্দ করে ভালোবেসেছিলেন, সাপোর্ট করেছিলেন; তাই আমি আজাদ রহমান হতে পেরেছিলাম।
ওঠার আগে জানতে চেয়েছিলাম—আবার কবে দেখা হবে? কৌতুকমাখা মৃদু হাসিতে মুখখানা উদ্ভাসিত করেছিলেন—কবে! অত সময় বোধ হয়... আচ্ছা দেখি। সেই ‘Avevi †`Lv nIqviÕ mgq Avi KL‡bv Av‡mwb; P‡j †M‡Qb wZwb wPiZ‡i| Zuvi m‡½ †mw`bKvi K_vgvjvi Ôivk-AwWIÕ GLb ïayB ¯§„wZ| G †jLv ˆZwii gyn~‡Z© AvRxeb webqx wcZ…Zzj¨ msMxZÁ cÖqvZ AvRv` ingv‡bi we‡`nx AvZ¥v‡K RvbvB nvRvi mvjvg| mygnvb Avjøvn Zuv‡K RvbœvZevmx Kiæb|