আজ প্রায় পয়ত্রিশটা বছর হলো, মা তার প্রিয় আস্তানা ফেলে রেখে, অজানা এক জায়গায়, অপরিচিত কিছু মানুষের সঙ্গে বসবাস করছেন। আর এই বিষয়টা সম্ভবত সৃষ্টিকর্তার মর্জিতেই সম্ভব হয়ে উঠে! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা মনে হয়, মেয়েদের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজস্ব ভূমি এবং নিজস্ব আস্থার লোকদের ছেড়ে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিকতা তাদের মধ্যে বৃদ্ধি করতে থাকেন। আর ঠিক এরকম অনুভূতিগুলো আমাদের স্ত্রীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়ে থাকে। যার ফলে তাদের দুই জনের কাউকে উপেক্ষা করা আমাদের উচিত নয়। কারণ তাদের এক জনের পায়ের নিচে আমাদের বেহেশত অপরদিকে এক জনের চারিত্রিক সার্টিফিকেট ছাড়াও কিন্তু আমরা বেহেশতে যেতে পারব না! এই দুই জনই মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এই দুই জনই পৃথিবীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অর্থাত্ এক জন আমাদেরকে পৃথিবীর মুখ দেখান আর অপরজন আমাদের সন্তানদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এক জন আমাদেরকে ঈমান শিক্ষা দেন অপর জন ঈমানের পূর্ণতা পেতে সাহায্য করে। তাই এক জনকে উপেক্ষা করে অপর জনকে গুরুত্ব দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। এক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদেরকে ভারসাম্যতা রক্ষা করে চলতে হবে। তবে বর্তমানে আমাদের সমাজে বাস্তব চিত্রটি হচ্ছে, হয় অতিমাত্রায় মাতৃভক্তির কারণে আমরা স্ত্রীর প্রতি অবিচার করি, আর না হয় স্ত্রীর ভালবাসায় অন্ধ হয়ে মা-বাবার মনে আঘাত দিয়ে তাদের সঙ্গে জুলুম করি। যার ফলে সংসার জীবনে আমাদের মাঝে চরম অশান্তি বিরাজ করে এবং জীবনটা তিক্ততায় ভরে উঠে। ফলে দুনিয়া বরবাদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আখিরাতও বরবাদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ ইসলাম এই দুই জনেরই হকের ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব প্রদান করেছে। এক ব্যক্তি রাসূল (স) কে জিজ্ঞাসা করল ‘ইয়া রসুলুল্লাহ! আমি সর্বাগ্রে কার সঙ্গে সদাচরণ করব? রসুল (স) বলেন, তোমার মায়ের সঙ্গে। লোকটি প্রশ্ন করল, তারপর? উত্তর এলো তোমার মা। লোকটি আবার জানতে চাইল অতঃপর কে? রসুল (স) এবারও জবাব দিলেন তোমার মা। ওই লোক চতুর্থবার একই প্রশ্ন করলে রসুল (স) বলেন, তোমার পিতা।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আর মায়ের অবাধ্য সন্তানদেরকে আখিরাতে কঠিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। কেননা ইমাম তাবরানী ও ইমাম আহমদের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, আলকামা নামক এক সাহাবি মারা যাচ্ছেন, এমন মুহূর্তে তার জবান থেকে কালেমা বের হচ্ছে না। খবর পেয়ে রসুলুল্লাহ এলেন এবং তিনি আলকামার মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি পুত্রের ওপর অখুশি? উত্তরে তিনি বললেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! আমার ছেলে আমার চেয়ে তার স্ত্রীকে বেশি গুরুত্ব দিত। এ কারণে আমি তার প্রতি নারাজ। তখন রসুলুল্লাহ হুকুম দিলেন, আলকামাকে আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দাও। আলকামার মা এ কথা শুনে গগনবিদারী চিত্কার দিয়ে বললেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! আমার চোখের সামনে আমার সন্তানকে আগুনে জ্বালিয়ে দিলে আমি মা হয়ে কেমন করে তা সহ্য করব? রসুলুল্লাহ (স) তখন আলকামার মাকে অনুরোধ করলেন, তাহলে আপনার সন্তানকে ক্ষমা করে দিন। তা না হলে অনন্তকাল ধরে সে জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। তা আপনি কী করে সহ্য করবেন? একথা শুনে মায়ের মন নরম হয়ে গেল, তিনি সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করে দিলেন। তারপর আলকামার জবান থেকে কালেমা তাইয়্যেবা জারি হয়ে গেল এবং কালেমা পড়তে পড়তে ইমানের সঙ্গে আলকামা মৃত্যুবরণ করলেন।
অপরদিকে স্ত্রীর হক সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর তোমরা তোমাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। আর যদি তাকে তোমার অপছন্দও হয়, তবু তুমি যা অপছন্দ করছ আল্লাহ তাতে সীমাহীন কল্যাণ দিয়ে দেবেন।”(সুরা : নিসা, ১৯)। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, “কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন মহিলার ওপর রুষ্ট হবে না, কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারবে।”(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৬৯) অন্য হাদিসে রয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।”(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১১৬২) তাইতো স্ত্রীর কাছে উত্তম ব্যক্তিকে ইসলাম উত্তম মানুষ বলে ঘোষণা করেছে। কেননা এ প্রসঙ্গে অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, হজরত নবী করিম (স) বলেন, “মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ মুমিন ঐ ব্যক্তি, যার ব্যবহার ও চরিত্র সর্বাপেক্ষা উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে স্ত্রীদের কাছে উত্তম।” -(তিরমিজি)। তাই আমাদের উচিত হবে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে মা-বাবাকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী গুরুত্ব দেওয়া এবং স্ত্রীকে তার অবস্থান অনুযায়ী গুরুত্ব দিয়ে পরিবারের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। তবেই আমাদের পরিবারগুলো শান্তির নীড়ে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ্।
lলেখক : শিক্ষার্থী, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া