চীনের প্রতি মোদির তোষামোদি নীতির মূল্য দিচ্ছে ভারত!

নয়াদিল্লি ভিত্তিক নীতি গবেষণা কেন্দ্রের কৌশলগত শিক্ষার অধ্যাপক ব্রহ্মা চেলানি বলেছেন, ‘চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হাঁটছেন তোষামোদি নীতিতে। বারবার চীনের অপ্রত্যাশিত কৌশলের কাছে ধাক্কা খেয়েও মোদির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসছে না। যার মূল্য দিতে হচ্ছে ভারতীয় জনগণ এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বকে।’

অধ্যাপক ব্রহ্মা চেলানি বার্লিনের রবার্ট বোশ একাডেমির একজন ফেলো, যিনি নয়টি বিখ্যাত বই রচনা করেছেন। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘এশিয়ান জুগারনাউট’, ‘ ওয়াটার: এশিয়া’স নিউ ব্যাটেগ্রাউন্ড’, ‘ ওয়াটার, পিচ অ্যান্ড ওয়ার’ প্রভৃতি।

অধ্যাপক চেলানি বলেছেন, চীনের সঙ্গে ভারতের বর্তমান অবস্থার জন্য মোদি নিজেই নিজেকে দায়ী করেছেন। তিনি তার নীতিতে অত্যধিক ব্যক্তিগতকরণ এবং একগুঁয়ে কৌশলের কারণে কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারেনি। যতদিন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিজের ভুলগুলি থেকে শিক্ষা না নেবেন এবং চীনের বিষয়ে তার তোষামোদি নীতিগুলোর পরিবর্তন না করবেন, ভারতীয় জনগণকে এবং এর আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বকে আরও মূল্য দিতে হবে।

তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত চীনের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভালো নেই নরেন্দ্র মোদি। আর চীনকে খুশি করতে বছরের পর বছর সময় কাটিয়ে দিয়েও মোদি ঝুলিতে জোটেনি তেমন কিছুই। বরং ভারতের দাবি করা ভূখণ্ড দখল নিয়েছে চীন। তবে আর কবে পরিবর্তন হবে মোদির দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশ্ন এখন অনেকের।

আরও পড়ুন:করোনায় বেঁচে গেলেও, সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে ফুসফুস!

বার্লিনের রবার্ট বোশ একাডেমির ফেলো চেলানি আরও বলেন, ঠিক যখন ভারত করোনা ভাইরাসের সঙ্গে প্রাণপণে লড়াই করছে, তখনেই চীন তাদের সেনাদের দিয়ে লাদাখ সীমান্তে ঝগড়া বাধিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ড দখল নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এমাসেই ভারতীয় জোয়ানদের সঙ্গে সংঘর্ষের পর এখন লাদাখের লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল (লএসি) এলাকায় প্রচুর অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ক্যাম্প স্থাপন করেছে চীনের পিএলএ সেনারা। চীনের এমন অপ্রত্যাশিত কৌশলগুলি মোটেই অপ্রত্যাশিত ভাবে নেওয়া উচিত হবে না। কারণ পিএলএ এ বছর ভারতীয় সীমান্তের কাছে নিয়মিত যুদ্ধ মহড়া চালিয়ে আসছিল।

লেখক চেলানি বলেন, তবুও মোদি এখনও চীনের আক্রমণ গুলো দেখতে পায়নি। তিনি এখনও চীনকে সন্তুষ্ট করে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায় এবং পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দুর্বল করে তুলতে চায়। যদিও পাকিস্তান নিজেই ভারতীয় ভূখণ্ডের বিশাল অংশ নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। ভারতের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত দীর্ঘদিন যাবত দেশটির জন্য বিশাল নিরাপত্তা ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে। যার ফলে অনেক ভারতীয় নেতাই একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বনের পক্ষে করেছেন।

আরও পড়ুন: একই কারখানায় করোনায় আক্রান্ত ১৩০০, জার্মানিতে শুরু হচ্ছে লকডাউন

১৯৯৯ সালের একটি উদাহরণ তুলে ধরে অধ্যাপক চেলানি বলেন, মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির প্রথম প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির দিল্লী থেকে লাহোরের নতুন বাস সার্ভিসের উদ্বোধনী সফরে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়লাভের চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে কার্গিলের ভারতীয় সীমান্ত অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আক্রমণ চালিয়েছিল। যার ফলে একটি স্থানীয় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আর সে কারণে দুই পক্ষেরই কয়েকশ সৈনিক প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু এবার মোদিও চীনের সঙ্গে বাজপেয়ি কায়দায় মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আলোচানায় বসার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই পিএলএ সেনারা লাদাখের চুমার অঞ্চলে প্রবেশের পথটি উন্মোচিত করে দিয়েছিল। যা পরবর্তীতে একটি অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করেছিল। বর্তমানে লাদাখের সমস্যা নিয়ে আলোচনার পর ভারত স্থানীয় প্রতিরক্ষামূলক দুর্গকে ভেঙে দিতে রাজি হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেও চীনারা সরে দাঁড়াচ্ছে না, যদিও এই শীর্ষ সম্মেলনটিকে সফল হিসাবে দেখানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: সৌদিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৫ বাংলাদেশি চিকিৎসকের মৃত্যু 

অধ্যাপক চেলানি বলেন, এখনও মোদি ভারতের তুষ্টির নীতি বজায় রেখে চলছেন। ২০১৮ সালে দালাই লামার তিব্বতের ভারত ভিত্তিক নির্বাসিত সরকারের সঙ্গে সরকারি যোগাযোগ থেকে আসল ভারত। আর এমন সময় ভারত শি জিনপিংকে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছিল। আর সেই প্রস্তাবও সানন্দে গ্রহণ করেছিল চীন। কারণ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকগুলি ভারতে বিপক্ষে চীনের প্রতিরোধমূলক কৌশলের সঙ্গে জড়িত থাকতে সহায়তা করে। এমন প্রায় ১৪টি বৈঠক ও দুইটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই নেতার মধ্যে। এসব সমস্যার মধ্যে মোদি তেমন কিছু অর্জন করতে না পারলেও, চীন তাদের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক লাভবান হওয়ার নীতিকে আরও ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়েছে।

ইত্তেফাক/আরআই