হাদিসের আলোকে তিন সংখ্যার সমাহার

রাসুলুল্লাহ (স) এর অনেক হাদিসে তিন সংখ্যার বিশেষত্ব দেখা যায়। কোনো হাদিসে বিশেষ তিনটি গুণ অর্জনের ব্যাপারে উত্সাহিত করেছেন। আবার কোনো হাদিসে বিশেষ তিনটি দোষের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। কখনো বিশেষ তিনটি কাজের ফলাফল বর্ণনা করেছেন। আবার কখনো তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো বিশেষত্ব বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের কয়েকটি হাদিস বর্ণনা করা হলো।

এক. তিনটি গুণ অর্জনে ইমানের স্বাদ পাওয়া যায় : আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন—যার মধ্যে তিনটি গুণ আছে, সে ইমানের স্বাদ পাবে, ১. আল্লাহ তার রাসুল অন্য সকল কিছু থেকে তার নিকট অধিক প্রিয় হওয়া। ২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। ৩. কুফরিতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মতো অপছন্দ করা। ( মুসলিম :১৬) দুই. তিন কাজের আদেশ :আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসুল (স) আমাকে তিনটি কাজের অসিয়ত করেছেন। ১. প্রতি মাসে তিন দিন সাওম পালন করা। ২. চাশতের সালাত আদায় করা। ৩. বিতর সালাত আদায় করে শয়ন করা। (বুখারী :১১৭৮) তিন. তিনটি সন্তান মৃত্যুবরণ করলে জান্নাত :রাসুল (স) বলেছেন—কোনো মহিলার তিনটি নাবালক সন্তান মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম। (বুখারী :১০১) চার. তিন ধরনের লোকের জন্য পুরস্কার :রাসুল (স) বলেছেন—তিন ধরনের লোকের জন্য দুটি করে পুরস্কার রয়েছে। ১. ঐ আহলে কিতাব, যে তার নবির ওপর ইমান এনেছে এবং রাসুল (স) উপর ইমান এনেছে। ২. যে কৃতদাস আল্লাহর হুকুম পালন করে এবং তার মালিকের হুকুম পালন করে। ৩. ঐ মালিক, যে তার কৃতদাসীকে মুক্ত করে দিয়ে তাকে বিবাহ করে নেয়। (বুখারী: ৯৭) পাঁচ. সত্যবাদী ব্যবসায়ীগণ তিন ব্যক্তির সঙ্গে থাকবে :আবু সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেন—সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীরা (আখিরাতে) নবিগণ, সিদ্দিকগণ (সত্যবাদীগণ) ও শহিদগণের সঙ্গে থাকবে। (তিরমিযী :১২০৯) ছয়. মৃত্যুর পরেও তিন আমলের সাওয়াব পাওয়া যায় :রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—‘যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সদাকাহ্ জারিয়াহ, ২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয়, ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দোয়া করতে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম :৪১১৫) সাত. তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় :রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—‘তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়। মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া ও সন্তানের জন্য পিতার দোয়া। (সুনানে ইবনে মাজাহ :৩৮৬২) আট. ঘুমন্ত অবস্থায় শয়তান মানুষকে তিনটি গিঁট দেয় :আল্লাহর রাসুল (স) বলেছেন—তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শয়তান তার ঘাড়ের পশ্চাদংশে তিনটি গিঁট দেয়। প্রতি গিঁটে সে এ বলে চাপড়ায়, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব, তুমি শুয়ে থাক। অতঃপর সে যদি জাগ্রত হয়ে আল্লাহেক স্মরণ করে তাহলে একটি গিঁট খুলে যায়, পরে অজু করলে আর একটি গিঁট খুলে যায়, অতঃপর সালাত আদায় করলে আর একটি গিঁট খুলে যায়। তখন তার প্রভাত হয় উত্ফুল্ল। অন্যথায় সে সকালে উঠে কলুষ কালিমা ও আলস্য সহকারে। (সহিহ বুখারী :১১৪২) নয়. আল্লাহ বান্দার তিনটি কাজ অপছন্দ করেন :মুগীরা ইবনু শু’বাহ (রা) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (স) কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন—(১) অনর্থক কথাবার্তা, (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক সওয়াল করা। (বুখারী শরীফ :১৪৭৭) দশ. তিনটি জিনিসের মধ্যে অকল্যাণ আছে :আবদুল্লাহ্ ইবনু উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনটি জিনিসে অকল্যাণ আছে। ঘোড়ায়, নারীতে ও বাড়িতে। (সহিহ বুখারী :২৮৫৮) এগারো. তিনটি জিনিস বান্দার কবর পর্যন্ত যায় :রাসুল (স) বলেছেন—‘তিনটি বস্তু মৃতব্যক্তির অনুসরণ করে। দুটি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবারবর্গ, তার ধন-সম্পদ এবং তার আমল তার অনুসরণ করে। তার পরিবারবর্গ ও তার ধন-সম্পদ ফিরে আসে এবং তার আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।’ (বুখারী শরীফ :৬৫১৪) বারো. মুনাফিকের তিনটি আলামত :আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন—‘মুনাফিকের আলামত তিনটি (১) সে কথা বললে মিথ্যা বলে; (২) ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে; (৩) এবং তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে’। (সহিহ মুসলিম :১১৫)  তেরো. উম্মতে মুহাম্মদীকে তিনটি জিনিস দ্বারা সম্মানিত করেছেন :রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন—‘অন্য সব উম্মতের চেয়ে তিনটি বিষয়ে আমাদেরকে (উম্মতে মুহাম্মদীকে) মর্যাদা দান করা হয়েছে। ১. আমাদের (সালাতের) কাতার বা সারি ফেরেশতাগণের কাতার বা সারির মতো করা হয়েছে। ২. সমগ্র পৃথিবী আমাদের জন্য মসজিদ করে দেওয়া হয়েছে। ৩. আর পানি না পেলে পৃথিবীর মাটিকে আমাদের জন্য পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ করে দেওয়া হয়েছে। (সহিহ মুসলিম :১০৫২) চৌদ্দ. তিন সময়ে নামাজ পড়া নিষেধ : উক্ববাহ্ ইবনু আমির আল জুহানী (রা) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স) কে বলতে শুনেছি। রাসুল (স) তিনটি সময়ে আমাদেরকে সালাত আদায় করতে এবং আমাদের মৃতদেরকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন :(১) সূর্য যখন আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উদয় হতে থাকে তখন থেকে তা পরিষ্কারভাবে ওপরে উঠা পর্যন্ত, (২) সূর্য যখন ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় থেকে হেলে যাওয়া পর্যন্ত, (৩) সূর্য ক্ষীণ আলোক হওয়া থেকে তা সম্পূর্ণ অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। (মুসলিম শরীফ :১৮১৪) পনেরো. আল্লাহর নিকট তিন কাজ হারাম অপর তিন কাজ অপছন্দনীয় :রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন—নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মায়েদের অবাধ্য হওয়া, জীবন্ত কন্যা সন্তানকে মাটিতে পুঁতে ফেলা এবং অন্যের হক আদায় না করা। আর তিনটি বিষয় তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন। তা হল :১. নিরর্থক কথা-বার্তা বলা, ২. অধিক প্রশ্ন করা এবং ৩. সম্পদ বিনষ্ট করা। (সহিহ মুসলিম :৪৩৭৫) ষোল. তিন যায়গায় মিথ্যা বলা যায়েজ :ইবনু শিহাব (রহ) বলেন, তিনটি স্থান ছাড়া আর কোনো বিষয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিথ্যা বলার অনুমতি দিয়েছেন বলে আমি শুনিনি। ১. যুদ্ধ কৌশলের ক্ষেত্রে, ২. মানুষের মধ্যে আপোষ-মীমাংশা করার জন্য, ৩. সহধর্মিণীর সঙ্গে স্বামীর কথা ও স্বামীর সঙ্গে সহধর্মিণীর কথা বলার ক্ষেত্রে। (সহিহ মুসলিম :৬৫২৭)

lলেখক :শিক্ষার্থী, আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া