বাং লাদেশের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীদের (পরিবহন শ্রমিক, গার্মেন্টস কর্মী, নির্মাণ শ্রমিক বিদেশগামী শ্রমিক) একাধিক সংগঠন থাকলেও নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। যেমনটি রয়েছে কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, ডাক্তার, প্রশাসনসহ অন্য পেশাজীবীদের। প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পেশাজীবীরা যেমনি নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে সক্ষম তেমনি দেশ ও জনগণের সেবা প্রদানে রাখছেন অবদান। পেশাজীবীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত, রাষ্ট্রের আইনকানুন এবং সরকারি নীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বিধায় তারা সরকার হতে প্রয়োজনীয় আনুকূল্য গ্রহণ এবং মেধা ও মনন দিয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এসব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের পেশাসহ অন্যান্য সমগোত্রীয় পেশার কর্মজীবীরা প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে সক্ষম হন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যুগোপযোগী জ্ঞান আহরণ করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে অবদান রাখতে সক্ষম হন।
সামাজিক মূলধন গঠনেও পেশাজীবীদের এসব প্রতিষ্ঠানসমূহ ভূমিকা পালন করে। এতে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি এবং সমৃদ্ধির মাত্রা ও গতিবেগ বৃদ্ধি পায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত পেশাজীবীরা অধিকতর সংগঠিত এবং দাবি-দাওয়া আদায়ে সক্ষম।
সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন কৃষিজীবীদের ও শ্রমজীবীদের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চিকিত্সক তার সেবার ফি নির্ধারণ করে, মালিক ভাড়া ঠিক করে অর্থাত্ পেশাজীবী ও মূলধনের মালিক তার সেবার ও বিনিয়োগের মূল্য ধার্য করতে পারলেও কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীরা তা কল্পনাও করতে পারে না। আমাদের কৃষকরা সবসময় দাম গ্রহণ করে, দাম নির্ধারণ করতে পারে না। অথচ তারাই বাংলাদেশের কর্মে নিয়োজিত জনসংখ্যার প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জিডিপিতে তাদের অবদান ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গার্মেন্টসে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমজীবীর জিডিপিতে অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। তাদেরও চাকরি তথা জীবিকার নিশ্চয়তা ধরে রাখতে জীবন বাজি রেখে হেঁটে, ট্রাকে চড়ে কর্মক্ষেত্রে ছুটে আসতে হয়। করোনার কথা মাথায় আসার অবকাশ নেই তাদের। বিদেশে মোট ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যে কঠোর কায়িক শ্রমের বিনিময়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়। প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি থাকলে করোনা বা অন্যান্য কারণে দেশে ফেরার পর যখন কর্মহীন হয়ে পড়ে তখন তারা আর্থিক, কারিগরি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করার সুযোগ পেত। কৃষক, শ্রমিক ও গার্মেন্টস কর্মীরাই মূলত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ তাদের জন্য নিজস্ব কোনো প্রতিষ্ঠান অদ্যাবধি গড়ে উঠেনি যেখানে তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ ও দুর্ঘটনায় চিকিত্সা, কঠিন সময়ে মানসিক শক্তি তথা মানসিক সুস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং প্রসূতি ও মাতৃত্বকালীন সেবা ও সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।
করোনাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় শ্রমজীবীরা সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় নিপতিত হন। কারণ এ সময়ে তাদের কাজকর্ম করার সুযোগ সংকোচিত হয় বা সুযোগ থাকে না। তাদের তখন পরিবার নিয়ে জীবন বাঁচানো দায় হয়ে দাঁড়ায়। আর তখন রাষ্ট্রকেই সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হয়। এ সহযোগিতা দীর্ঘ মেয়াদে করা আমাদের মতো দেশের পক্ষে দুরূহ। এমতাবস্থায়, সরকারকে জীবন ও জীবিকা দুটোর দিকেই লক্ষ্য রেখেই নীতি নির্ধারণ করতে হয়।
মূলত অসংগঠিত ও নেতৃত্ব প্রদানে যোগ্য ব্যক্তিত্বের অভাবের কারণেই কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীরা অদ্যাবধি নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে তাদের সরকারের নীতি ও পরিকল্পনায় নিজেদের মতামত প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতার পরিবর্তে সরকারের গৃহীত নীতির ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হতদরিদ্র এসব কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীদের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং তাদের উত্পাদন ও শ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি একান্ত প্রয়োজন। এতে শুধু যে তারাই উপকৃত হবেন তা নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় হলে তাদের পণ্য ও সেবার মান যেমনি বাড়বে তেমনি সমাজের বৈষম্য কমবে, দৃঢ় হবে অর্থনৈতিক ভিত্তি।
কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীদের যেহেতু নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, কারিগরি এবং ব্যবস্থাপনাগত সামর্থ্যের ঘাটতি রয়েছে, তাই রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হয়ে তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সহায়তা করতে হবে। যাতে সংশ্লিষ্ট সব কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীরা নিজেদের পণ্য ও সেবার ন্যায্য মূল্য নির্ধারণসহ টেকসই উত্পাদন ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হন। সেই সঙ্গে তাদের নিজেদের ও পরিবারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণপূর্বক আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়তা প্রদান করতে পারেন।
কৃষিজীবীসহ সব শ্রমজীবীর প্রতিষ্ঠান গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদানের জন্য সর্বোপরি প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ ও প্রণোদনা, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ। যারা দেশের অর্থনীতির চালিকা তাদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে দেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
লেখক :অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম,
অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,
ময়মনসিংহ এবং মো. কাওছারুল ইসলাম, কৃষি অর্থনীতিবিদ