বিভিন্ন ঘটনাবহুল বছর ২০১৮ অতিক্রম করল। বিশেষত রাজনৈতিকভাবে বছরটি ছিল দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে নির্বাচনী আমেজ ছিল সারা বছরজুড়েই। একাদশ সংসদ নির্বাচন সব দল অংশগ্রহণ করায় রাজনীতির মাঠ সরগরম ছিল। এই প্রথম দেশে কোনো সরকার চতুর্থবার এবং টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বেড়ে গেল।
খেলাপি ঋণের বিষয়টি গত বছরজুড়েই আলোচনার বিষয় ছিল। বহুসংখ্যক ব্যাংক ও নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণে জর্জরিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। সর্বশেষ তথ্য বলছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। দেশের ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠার জন্য অনবরত তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। তাই নতুন বছরে নতুন সরকারের কাছে খেলাপি ঋণের ব্যাপারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
সরকার দেশে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য ঋণে ৯ এবং আমানতে ৬ শতাংশ সুদ হার প্রথমে ১ জুলাই পরে ৯ আগস্ট থেকে কার্যকর করার কথা ঘোষণা দেয়। জানা যায়, ঘোষিত এ হার অধিকাংশ ব্যাংক কার্যকর করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণেই উল্লেখিত সুদের হার কার্যকর করা যায়নি। নতুন সরকার ঘোষিত সুদের হার অতি দ্রুত কার্যকর করবে এটাই সবার প্রত্যাশা।
বিনিয়োগ নিয়ে অনেক কথা শুনা গেলেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসছে না। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছে না। সম্প্রতি ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ পরিসংখ্যান-২০১৯ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে এফডিআই আহরণ পাঁচ বছরের মধ্যে গতবছর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) এর বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন-২০১৮ অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে মাত্র ২১৬ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে যা প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মোট জিডিপির ৩০-৩৩ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যেখানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ৩০ শতাংশের নীচে ওঠানামা করছে। প্রকৃত বিনিয়োগ বাধা দূর করতে এবং ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ তৈরি করার ক্ষেত্রে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
চলতি অর্থবছরের গেলো ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ কার্যকর করতে হলে মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনতে হবে। তা না হলে আমানতকারীরা ব্যাংকে আমানতের উত্সাহ হারিয়ে ফেলবে।
দেশে বেকারত্বের এখনও বড় সমস্যা। প্রতি বছরই উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের বড় অংশ বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। বিশ্ব বিখ্যাত সাময়িকী ইকোনমিস্ট এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বেকারের হার বাংলাদেশেই বেশি।
দেশ থেকে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক ধারণাগত পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির আকারের প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের কাতারে চলে এসেছে। তবে দেশে অতি ধনীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত হারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এই অতি ধনী বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক। অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী উন্নয়নের সুবিধা কেবল অধিকাংশই ধনীক শ্রেণির দখলে চলে যাচ্ছে। অক্সফাম প্রবৃদ্ধিকে সংখ্যা দিয়ে না দেখে গুণগতমান দেখার পরামর্শ দিয়েছে। তারা বলছে, প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। আয় বৈষম্যের কারণে দারিদ্র্য বিমোচনে প্রবৃদ্ধির কার্যকারিতা কমেছে। ধনী দরিদ্র্যের ব্যবধান কমাতে হলে দেশে আইনের শাসন, জবাবদিহিতামূলক শাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি সে সাথে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের তথা কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।
জনবহুল এ দেশে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মনে হচ্ছে বাংলাদেশকে দীর্ঘ সময় এ বোঝা টানতে হতে পারে। এ ঘটনা ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও সার্বিক নিরাপত্তার উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে অনেক আলাপ আলোচনা হলেও সংকট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসছে না। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থী দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সম্প্রতি জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি বেশ কিছু ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রবণতার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের কথা বলা যায়। উপসাগরীয় দেশগুলো এ শ্রমিকদের আর নিতে না চাইলে বা তাদের কোনো কারণে পাঠিয়ে দিয়ে বিপদ হবে। অন্য দেশগুলো ‘মেড-ইন-বাংলাদেশ’ স্টিকারযুক্ত পোশাক কিনতে না চাইলেও বিপদ আছে। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ না হওয়াটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় দুর্বলতা। এ পোশাকেই রপ্তানি হয় মোট রপ্তানির ৮৩ শতাংশ। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ঝুঁকির কথাও বলছেন অনেকে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ বরাবরই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।