গত কয়েকদিন থেকে ব্রহ্মপুত্র নদসহ যমুনা, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি কমে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৬ টি ইউনিয়নের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘটের পানি স্থির রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পায়নি বলে বন্যাকবলিত দুঃস্থ পরিবারগুলো অভিযোগ করেছেন। ফলে তারা তীব্র খাদ্র সংকটে পড়েছেন।
এদিকে কয়েকদিন বৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার করতোয়ার পানি কমতে শুরু করেছে কিন্তু তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের এই সময়ে গাইবান্ধার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙন।
বৃহস্পতিবার গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বন্যাকবলিত ও নদী ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। প্রতিবছর নদী ভাঙনে এই ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষ নিঃস্ব হচ্ছেন। তার উপর চলতি বছর করোনায় ভেঙে গেছে মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। এরপর অসময়ের এই বন্যায় তারা হতবিহবল হয়ে পড়েছেন।
এই ইউনিয়নের গোঘাট গ্রামের দিনমজুর আয়েন উদ্দিন (৫০) জানান, আগে তার ২০ বিঘা জমি ছিল। দৈনিক ৩-৪ জন দিনমজুর তার বাড়িতে কাজ করতেন। ১০ বছরে নদীতে সব বিলীন হয়েছে। এখন তিনি নিজেই দিনমজুরের কাজ করেন। করোনা আসার আগে দিনমজুরের কাজ করে দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকা মজুরি পেতেন। করোনার কারণে প্রায় দুই মাস কাজ বন্ধ ছিল। তখন ঘরের তিনটি ছাগল বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছিলেন। সেই টাকাও শেষ হলো। এমন সময় লকডাউনও খুলে দেওয়া হলো। শুরু হলো পুনরায় দিনমজুরের কাজ। কিন্তু বন্যা আসায় সেই দিনমজুরি আবার বন্ধ হলো। এখন ধারদেনা করে চলছেন।
একই গ্রামের ছবিউল মিয়া বলেন, করোনা আমাদের পঙ্গু করে দিয়েছে। সেই ঘা এখনো শুকাইনি। এরমধ্যেই বন্যা এসেছে। যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। তিনি বলেন, দশদিন ধরে পানির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছি। ঘরে খাবার নেই। কিন্তু চেয়ারম্যান মেম্বররা ত্রাণ দিলো না। তার মত কামারজানি ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষ এভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
এই গ্রামে আরও দেখা গেল বাড়িতে পানি ওঠায় আঙ্গিনায় চৌকির উপর রান্নাবান্নার কাজ করছিলেন মায়া রাণী সাহা (৫৫)। তিনি বললেন, দশদিন থেকে পানির মধ্যে বাস করছি। উচু জায়গায় যেতে পারিনি। ঘরের মেঝেতে পানি। খড়খুটো ভিজে গেছে। খড়ি দিয়ে চৌকির উপর রানা করছি।
তিনি আরও বলেন, অনেকদিন আগে স্বামী মারা গেছে। দুই সন্তান নিয়ে ধারদেনা করে চলছি। কিন্তু গত দশদিনে কোনো ত্রাণ পাইনি।
একই ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামের আঙ্গুর মিয়া (৪৫) বলেন, আমরা নদীর পাড়ের মানুষ। নদীর পানি বাড়লে আমাদের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। তিনি আরও বলেন, এবারের বন্যায় তার তিন মন ধান ভেসে গেছে। ঘরের বেড়া নষ্ট হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনো রিলিপ পাই নাই।
কামারজানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস ছালাম বলেন, ইউনিয়নটিতে মোট লোকসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এরমধ্যে ১৪ হাজার মানুষ অভাবী। নদী ভাঙনের কারণে এ ইউনিয়নে অভাবী লোকের সংখ্যা বেশি। কিন্তু সে অণুপাতে ত্রাণ বরাদ্দ পাইনি। বন্যার কারণে এ পর্যন্ত ১৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি। যা ১০ কেজি করে এক হাজার ৪০০ জনের মধ্যে বিতরণ করেছি। এ ছাড়া ২২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে হাতে কোনো ত্রাণ নেই। তাই দিতে পারছি না। বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে ত্রাণ চেয়ে আবেদন জানানো হয়েছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রসুন কুমার চক্রবর্তী বলেন, কামারজানি ইউনিয়নে অভাবী লোকের সংখ্যা বেশি ঠিক। কিন্তু অভাবী লোকের হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয় না। প্রতিটি ইউনিয়নে মোট জনসংখ্যার ভিত্তিতে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। তবে কামারজানির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মোখলেছুর রহমান জানান, গত ৬ ঘন্টায় করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালি পয়েন্টে ৩ সে.মি. কমেছে। অপরদিকে তিস্তার পানি এক সে.মি. পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদ, যমুনা ও ঘাঘটের পানি বাড়েওনি-কমেওনি, স্থির হয়ে আছে। তিনি বলেন, যে কোন সময় ব্রহ্মপুত্র নদ, যমুনা ও ঘাঘটের পানি বৃদ্ধি শুরু হতে পারে। ফলে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিশ আলী জানান, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি নেমে যাওয়ার সাথে ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী ১৩টি পয়েন্টে গত দুইদিনে প্রায় দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি ও প্রচুর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, জেলার বন্যা কবলিত এলাকায় বিতরণের জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ইত্তেফাক/এএম