সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ইসলাম

ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থার নাম, যা পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।  গোত্রপ্রীতি বা স্ব্যজনপ্রীতি মানুষের চিরন্তন স্বভাব, যার পরিণতি অত্যন্ত অশুভ। সমাজজীবনে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অশান্তি প্রভৃতি স্বজনপ্রীতির বিষফল। এই চেতনা অত্যন্তু হীন, নিচু ও সংকীর্ণ মানসিকতা; যার কারণে  বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ এমনকি যুদ্ধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ইসলাম এসবের অবসান ঘটিয়ে সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি, সংহতি, ন্যায় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এক আদর্শ।

ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবদের মধ্যে অন্যায়, অবিচার, নির্যাতনসহ সব ধরনের সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণু চেতনা বিরাজ করেছিল। ক্ষুদ্র বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত ও বিভেদ লেগে থাকত। ফলে ঐতিহাসিকগণ তাদের যুদ্ধবাজ জাতি হিসেবে উল্লেখ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। মহানবি (স) অত্যন্ত কঠোরভাবে এসব সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের মূলোচ্ছেদ করেন। সৃষ্টিগত দিক থেকে মানুষ একই উত্স থেকে এসেছে। ফলে তাদের মধ্যে ভেদাভেদ নেই। আল্লাহ বলেন, হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের একই পুরুষ ও নারী হতে সৃজন করেছি এবং বিভিন্ন গোত্রে ও পরিবারে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিকতর সম্মানীত, যে অধিক আল্লাহভীরু (সুরা আল হুজুরাত:১৩)। অন্যত্র এসেছে, কোনো গোত্রের বাড়াবাড়ি যেন তোমাদের ইনসাফ থেকে বিমুখ না করে। জেনে রাখবে, ন্যায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী (সুরা আল মায়িদা ৮)।

রাসুল (স) বলেন, সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কেয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন করব। (আবু দাউদ) প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম মানুষের ভেতরে তার প্রকৃতিগত গুণ তথা মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটিয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে, পরে ভালো মুসলমান। যিনি ভালো মুসলমান তিনি ভালো মানুষও বটে। হাদিসে বলা হয়েছে, তোমরা ইমান না আনা পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আবার পরস্পরকে ভালোবাসতে না পারা পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না।

হিজরতের পর মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে আনসার ও মুহাজিরগণ ছাড়াও ইয়াহুদি-খ্রিষ্টান এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোক বসবাস করত। তাদের মাঝে তখনো বিভিন্ন বিবাদ চলমান ছিল। নবি (স) ইসলামি রাষ্ট্রের সংবিধান মদিনা সনদের  মাধ্যমে মুসলিম-অমুসলিমনির্বিশেষে সবার মাঝে সম্প্রীতি নিশ্চিত করেছেন। উক্ত চুক্তির শর্ত ছিল ভিন্নমতাবলম্বীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, যা প্রায় সবার নিকট প্রশংসিত হয়েছে। ঐতিহাসিক হিট্রি বলেন, আরবের ইতিহাসে রক্তের পরিবর্তে ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে কায়েম করার প্রচেষ্টা এই প্রথম।

দ্বিতীয় হিজরিতে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে কুরাইশদের সঙ্গে নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যার নাম বদরের যুদ্ধ। দীর্ঘ চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে যখন ইসলাম সুসংহত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং মুসলমানদের অসামান্য সাহস উদ্দীপনা আত্মপ্রত্যয়ের  মাধ্যমে বদরের যুদ্ধে বিরোধী শক্তি পরাজিত হয়, তখনো তার সাহাবিগণের মানসে বিন্দুমাত্র প্রতিশোধস্পৃহা জাগ্রত হয়নি। যুদ্ধে বন্দিদের প্রতি মহানবি (স)-এর নির্দেশ পর্যালোচনা করলে সেটি খুব সহজেই অনুমেয় হয়। তিনি আদেশ করলেন, বন্দিদের প্রতি ভালো ব্যবহার করো। তার আদেশ সবাই যথাযথভাবে পালন করলেন। ফলে কেউ কোনো বন্দির সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। প্রতিপক্ষের প্রতি যে উদারতা তিনি সেসময় স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ও অনুসরণীয় ঘটনা। কুরআনে এসেছে, আল্লাহর পথে তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো, কিন্তু তোমরা কখনোই আক্রমণকারী হবে না। অবশ্যই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না। (সুরা আল বাকারা :১৯০)

ষষ্ঠ হিজরিতে রাসুল (স) উমরাহ পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা দিয়েছিলেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিধর্মীদের সঙ্গে পরবর্তী ১০ বছর নিরবচ্ছিন্ন শান্তি রক্ষার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কুরআনে এ চুক্তিকে সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ তখন মুসলিমগণ অনেক শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর। সাম্প্রদায়িকতার বিন্দুমাত্র  ছোঁয়া ইসলামে থাকলে মুসলিমগণ এই চুক্তি অস্বীকার করে তলোয়ার নিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতেন। কিন্তু তারা তা করেননি।

অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় হয়। ইতিপূর্বে যারা নবি (স) ও তার সাথিদের দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল, তাদের প্রতিও তিনি উদারতা প্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, আজকে কারো কাছ থেকে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে না। শুধু তাই নয়, যদি কেউ আবু সুফিয়ানের গৃহ কিংবা কোনো উপাসনালয়ে আশ্রয় নেয়, সে নিরাপত্তা পাবে।

সবশেষে বিদায় হজের ভাষণে তিনি লক্ষাধিক সাহাবার সামনে অসাম্প্রদায়িকতার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই বিরল। তিনি বলেন, আজকের এই দিন (আরাফাতের) এই জিলহজ মাস এবং মক্কা নগরী তোমাদের নিকট যেরূপ পবিত্র, তদ্রুপ তোমাদের মহাপ্রভু আল্লাহ তাআলার সমীপে উপনীত হওয়া পর্যন্ত পরস্পর তোমাদের রক্ত ও অর্থ অলঙ্ঘনীয় মনে করবে।

একবিংশ শতকে এসে মানবাধিকার ও সম্প্রীতির দাবিদার অনেক উন্নত রাষ্ট্রে যখন শ্বেতাঙ্গ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হতে দেখি, তখন প্রশ্ন জাগে, তাদের সেই মানবিকতা কোথায়? তারা সারা বিশ্বে মানবতার ফেরি করে বেড়ায় কেন? শুধু কি প্রচারের উদ্দেশ্যে না বাস্তবায়নের জন্য?

lলেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া