করোনায় শিক্ষার্থীদের অবসর যাপন

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে এখন সারা বিশ্ব। বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। দিনদিন বাড়ছে সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। ঘরবন্দি অবস্থায় শিক্ষার্থীদের এই দিনগুলো কেমন কাটছে এ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন— মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ

ইউছুব ওসমান

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী

নতুন বছরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে জবি ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলাম। সঙ্গে ছিল কিছু ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটাকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার তীব্র ইচ্ছা; কিন্তু করোনা নামক এই মহামারি তাতে জল ঢেলে দিয়ে স্বপ্ন ভাঙার পাশাপাশি হূদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে। করোনার কারণে একদিকে ঘরে বন্দি জীবনযাপন কিছুটা বিরক্তিকর হলেও পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর আনন্দটা উপভোগ করছি বেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান, পরীক্ষাসহ প্রায় সব শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ থাকায় পাঠ্যবই পড়া না হলেও সাহিত্য আর রোমাঞ্চকর কিছু বই পড়ে সময়টা মোটেই খারাপ যাচ্ছে না।

 

ফাতেমা তুজ জোহরা ইমু

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী

ক্যাম্পাসের অলিগলি, আর সিনিয়র জুনিয়র মেলবন্ধন যখন আমাকে আকৃষ্ট করে ফেলল তখন মায়ের অসুস্থতা আমাকে বাড়ির পথ ধরতে বাধ্য করল। ভেবেছিলাম কয়েক দিন পর আবার জমবে আড্ডা, ফিরে যাব ক্যাম্পাসে; কিন্তু করোনাকালীন বন্ধ আমাকে আটকিয়ে দিল চারদেওয়ালের মধ্যে। গান শোনা, মুভি দেখা, নাটক দেখাও হয়েছে শ খানেক। ধর্ম চর্চা করেও কাটছে সময়। বন্ধুদের সঙ্গে কথাও হচ্ছে; কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে তাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোকে মনে করে, হচ্ছে দীর্ঘশ্বাস। সুস্থ পরিবেশে একটা সুন্দর সকালের পাশাপাশি বসে আবার যেন ক্লাস করতে পারি, চেনা মুখগুলোকে যেন এবার সুস্থ অবস্থায় দেখতে পারি।

 

তানজিলা তাবাসসুম অন্তি

ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী

ভার্সিটি বন্ধের পর মনে হয়েছিল খুব দ্রুতই সবকিছু আবার তার প্রাণ ফিরে পাবে; কিন্তু দেখতে দেখতে তিন মাসের বেশি সময় চলে গেল; কিন্তু এই সময়টা অতটাও খারাপ যাচ্ছে না; কিন্তু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হচ্ছে, যা আমাদের ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল। এখন সময় যাচ্ছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, মাঝেমধ্যে পরিবারের জন্য রান্নার মাধ্যমে, বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে আড্ডা দিয়ে, টুকটাক লেখালিখিও হচ্ছে এখন। এখন যেন নতুনভাবে আবিষ্কার হচ্ছে পরিবারের গুরুত্ব কতটা। দিনের বেশি সময়টা কাটছে মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে। অনলাইন থেকে বিভিন্ন জিনিস শেখার চেষ্টা করছি।

মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী

তিন মাস ধরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি কাটাচ্ছি। হঠাত্ করে এই অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে বাড়িতে এসে প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও পরে একটু কেমনই যেন লাগছিল। যারা বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করে, প্রায় সবারই পরিস্থিতি ঠিক এমনটাই; কিন্তু বিশ্ব আজ অসুস্থ, ঘরবন্দি হয়েই কাটাতে হবে পুরো ছুটি। এই বিশাল ছুটিকে হেলায় ফেলায় কাটিয়ে দিলে হবে না। কাজে লাগাতে হবে। নতুন কিছু শেখার প্রয়াস করতে লাগলাম। প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার, জানার চেষ্টা করলাম। বাসায় বসে বিশ্ব ইতিহাসকে কাছ থেকে জানারও উত্তম সময় এটা। আবার কেনই বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকব? শুরু করে দিলাম বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কোর্সসমূহ।

 

সাদিয়া নওশিন বিন্তী

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী

এই সময়ে আমার মতো সবাই ঘরে অবস্থান করে বিভিন্ন কাজ করে অবসর সময় কাটাচ্ছে। এই অবসর সময়ে আমি গল্পের বই পড়ে ও বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করার মাধ্যমে সময় পার করছি। পাশাপাশি ঘরে আম্মুকে কাজে সাহায্য করছি, আপুর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, আব্বুর কাছ থেকে অনেক শিক্ষণীয় উপদেশ পাচ্ছি। মাঝেমধ্যেই নিজের পছন্দের কাজগুলো করছি যেমন— ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি অন্যরকম ইচ্ছে ছিল যা ব্যস্ততার কারণে করা হয়ে ওঠেনি। এখন তা করতে পারছি। এছাড়াও অনলাইন এখন বিনা মূল্যে অনেক কোর্স করা যাচ্ছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাকে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

 

প্রকৃতি আশেক

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী

সারাদিন বাসায় শুয়ে-বসেই সময় পার করছি আমরা। হয়তো কিছুক্ষণ ফোন টিপছি, কতক্ষণ ফেসবুক চালাচ্ছি তো আবার কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছি, আবার কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সঙ্গে লুডো খেলছি, ইউটিউবে বসে কিছু রান্নার ভিডিও দেখছি, বেশ কিছু নতুন মজাদার আইটেম ট্রাই করছি। আবার ইউটিউবে বসে কিছু ইংরেজি কোর্স করছি। বাবা-মার সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছি, এভাবে করেই সময় পার হয়ে যাচ্ছে। জানি না এভাবে আর কত দিন কাটবে; কিন্তু একদিন আশা করি ভালো সময় আসবেই যেদিন করোনা ভাইরাস বলে আর কিছু থাকবে না। আবার সচেতন নাগরিক হিসেবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি।