এই বার্তা দুশ্চিন্তার

কিছুদিন পূর্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কার্টুন বেশ ঘুরাফিরা করিতেছিল, যাহাতে দেখা যায়, করোনা মহামারি চলিয়া যাইবার পর এক শিক্ষক তাহার শিক্ষার্থীদের দেখাইতেছেন, ‘এই দেখো, এই কবরে করোনায় মারা যাওয়া লোক।’ সেইখানে দেখা গেল হাতেগোনা কিছু লোক। ঐ শিক্ষক পাশের আরেকটি কবর দেখাইয়া বলিলেন—এইখানে চিরনিদ্রায় রহিয়াছে করোনার কারণে অনাহারে মারা যাওয়া লোক। দেখা গেল, পরের কবরস্থানে রহিয়াছে অনেক বেশি কবরের সারি। ইহার বার্তাটা স্পষ্ট, করোনায় যত না মানুষের মৃত্যু ঘটিবে, তাহা অপেক্ষা অধিক মানুষ মারা যাইবে করোনাসৃষ্ট খাদ্যাভাবে। ইতিমধ্যে করোনার জন্য ধস নামিয়াছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কর্মহীন হইয়াছে বহু মানুষ। এই পরিস্থিতিতে আরো ভয়ংকর একটি সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। সংস্থাটি সমীক্ষা করিয়া জানাইয়াছে, করোনা ভাইরাস মহামারির প্রভাবে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকটে পড়িবে সমগ্র বিশ্ব। আর তাহাতে প্রতিদিন অনাহারে অন্তত ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হইতে পারে! অক্সফামের প্রতিবেদনে ইহাও বলা হইয়াছে—অর্থনৈতিক সংকট ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার চাইতেও এখন দ্রুতই অনেক বেশি ঘনীভূত হইতেছে। এই সংকটে ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মুখে পড়িতে পারে। বলা যায়, ১৯৯০ সালের পর বিশ্বে প্রথম বাড়িয়া যায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা।

নিঃসন্দেহে ইহা এক ধরনের ট্র্যাজেডি। কারণ জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব হইতে অনাহারে মানুষের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামাইয়া আনিবার। অথচ অকস্মাত্ দেখা দেওয়া মহামারিতে বিশ্বের মানুষের গড় উপার্জন ২০ শতাংশ হ্রাস পাইবার কারণে চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৪৩ কোটিরও বেশি বাড়িয়া গিয়া বিশ্বব্যাপী তাহা দাঁড়াইতে পারে ১২০ কোটিতে। বিবিসির প্রতিবেদন বলিতেছে, আগামী দিনে সবচাইতে বেশি খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে ইয়েমেন, আফগানিস্তান ও কঙ্গোতে। এমনকি ভেনিজুয়েলা ও দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলি, যেইখানে খাদ্যসংকট চরমে ছিল, সেইখানে মহামারির কারণে এই সংকট আরো ভয়াবহ পর্যায়ে চলিয়া যাইতেছে। কেবল তাহাই নহে, মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলেও মহামারির কারণে মানুষ না খাইয়া থাকিবার মতো পর্যায়ে চলিয়া যাইতেছে। জাতিসংঘের ‘স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বলা হইতেছে, গত বত্সর ২০০ কোটি মানুষ খাদ্যজনিত অনিরাপত্তায় ভুগিয়াছে। ইহার মধ্যে ৭৪ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ তীব্র খাদ্য-অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। সেই সংখ্যাটি এখন আরো বাড়িয়াছে।

করোনার কারণে খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক বিশ্বের সিংহভাগ দেশ সতর্ক অবস্থানে রহিয়াছে। তাহারা তুলনামূলক রক্ষণশীল হইয়া পড়িয়াছে। ফলে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে উদ্বৃত্ত খাদ্যের বণ্টনেও এক ধরনের জটিলতা দেখা দিয়াছে। ইহাও চিন্তার। সুতরাং করোনার প্রত্যক্ষ অভিঘাতের পাশাপাশি পরোক্ষ অভিঘাতেও যাহাতে অধিক মানুষের মৃত্যু না হয়, সেই ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।