প্রাচীন বিস্তারবাদ থেকে আধুনিক বিকাশবাদ

নিউটন মজুমদার

প্রাচীন যুগে মানুষের জীবনব্যবস্থা ছিল যাযাবর ধরনের, তারা জীবিকার তাগিদে কখনো নির্দিষ্ট কোনো স্থানে স্থায়ী আবাসস্থল স্থাপন করতে পারেননি। এক স্থানের খাদ্য ফুরিয়ে গেলে তারা খাদ্যের অন্বেষণে নতুন স্থানে চলে গেছেন। তবে কৃষি ব্যবস্থার উদ্ভব এবং পশুপালনের পদ্ধতি করায়ত্তের পর থেকেই মানুষ নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করে। এভাবেই উদ্ভব হয় বৃহত্ সমাজ ব্যবস্থার, এই সমাজ ব্যবস্থা প্রসারিত হয়ে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রে রূপ পরিগ্রহ করে, যাকে কেন্দ্র করে বিকাশ লাভ করেছিল বিভিন্ন সভ্যতা। কালের বিবর্তনে অনেক সভ্যতা বা নগররাষ্ট্রই হারিয়ে গেছে, তবে যে নগররাষ্ট্রগুলো আজও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলোই আজকের আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

ঐতিহাসিকগণের মতে, পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার বিকাশ হয় নবোপলীয় যুগে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০০—৩২০০ অব্দে মেনেসের নেতৃত্বে নীল নদের অববাহিকায় প্রাচীন মিশরে। যার শাসক ছিলেন ফারাও-রা। অতঃপর এ সভ্যতা লিবিয়ার বর্বর জাতি, অ্যাসিরীয়দের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয় এবং ৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্যের হাতে মিশরীয় সভ্যতার সূর্য অস্তমিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল আরেক প্রাচীন সভ্যতা, যার নাম সিন্ধু সভ্যতা। ৩৫০০—১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাঞ্জাব থেকে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে এ সভ্যতার বিস্তৃতি ছিল। ধারণা করা হয়, আর্য জাতির আক্রমণের ফলে ১৫০০ অথবা ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিন্ধু সভ্যতার অবসান ঘটে। অপর আরেকটি প্রাচীন সমৃদ্ধ সভ্যতার নাম গ্রিক সভ্যতা। গ্রিক সভ্যতা ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিকশিত সমরতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত একটি সভ্যতা। এই সভ্যতার মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ মহাকাব্যের বর্ণনায় মেলে ট্রয় নগরীসহ প্রায় ১০০ নগরীর ধ্বংসস্তূপ, ইতিহাসের জনক হেরোডটাসের গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা এবং বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসের জনক থুকিডাইডেসের বই ‘দ্য পেলোপনেসিয়ান ওয়র’সহ সামরিক নগররাষ্ট্র স্পার্টার অসংখ্য সংঘাতের সাক্ষী এই গ্রিক সভ্যতা। আবার এই সভ্যতায়ই পেরিক্লিসের হাত ধরে নগররাষ্ট্র এথেন্সে চূড়ান্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে পেরিক্লিসের মৃত্যুর পর ৪৬০ থেকে ৪০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এথেন্স ও সামরিক নগররাষ্ট্র স্পার্টার মধ্যে তিনবার যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এথেন্স স্পার্টার অধীনে চলে যায়।  ধারণা করা হয়, বন্যা অথবা বিদেশি আক্রমণের ফলে এই সভ্যতাও ধ্বংস হয়। এছাড়া প্রাচীন রোমান সভ্যতা ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিকাশ লাভ করে এবং ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মান বর্বর গোত্রের তীব্র আক্রমণে রোমান সম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। এভাবেই বিকাশ লাভ করেছিল প্রাচীন সভ্যতাগুলোর সোনালি যুগ, অতঃপর বিস্তারবাদের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে কবর রচিত হয় এ সভ্যতাগুলোর।

ভারতবর্ষে সিন্ধু সভ্যতার পতনের পর আর্যদের নেতৃত্বে শুরু হয় বিভিন্ন জনপদের শাসন। আলেকজান্ডার ভারত ত্যাগের মাত্র দুই বছর পর ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে ভারতে বংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রমান্বয়ে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন বংশ দ্বারা প্রাচীন ভারতের বৃহত্ অংশ শাসিত হয়। অতঃপর ৭১২ খ্রিস্টাব্দে আরবীয় মুসলিম যোদ্ধা মুহম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযানে রাজা দাহিরকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন এবং ১২০৪ সালে তুর্কি বীর ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বাংলার ক্ষমতা দখল করে নেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের জাতি-গোষ্ঠীর হাতেই ভারতবর্ষ এবং বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল বেদখল হয়। তবে মধ্যযুগে বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী নীতি বা বিস্তারবাদ ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপীয় দেশসমূহের উপনিবেশ। এই উপনিবেশ বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যেমন: ১৩৩৭—১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, ১৭৫৬—১৭৬৩ উপনিবেশবাদকে কেন্দ্র করে ইউরোপসহ বিভিন্ন  ঔপনিবেশিক অঞ্চলে সংঘটিত হয় সাত বছরের যুদ্ধ, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ১৮১৩—১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র ইউরোপের নেপলীয় যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। তবে দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ১৭৮৩ সালে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশদের হাত থেকে আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর হতে ঔপনিবেশিকতার বাঁধে চিড় ধরে এবং বিস্তারবাদের বিদায়ঘণ্টা বাজতে আরম্ভ করে। এরপর একটার পর একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটতে থাকে পৃথিবীর মানচিত্রে।

আধিপত্যকামী মানসিকতা বা বিস্তারবাদের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম এবং মধ্য ভাগে, জার্মানির অনমনীয় কর্তৃত্ববাদী আচরণে ১৯১৪ এবং ১৯৩৯ সালে আধুনিক বিশ্ব দুটো ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। অতঃপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হয় নতুন মোড়ল। নব্য সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে আমেরিকা ও রাশিয়া বিভিন্ন দেশে নিজেদের সেনা মোতায়েন করে ঐসব দেশের ওপর তাদের প্রভুত্ব স্থাপন শুরু করে, ফলশ্রুতিতে দুই পরাশক্তি শক্তি প্রদর্শনে মত্ত হয়। উভয় দেশের মধ্যে শুরু হয় শীতল বা স্নায়ুযুদ্ধ। তবে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের মধ্যে দিয়ে আমেরিকা একক প্রভুত্ব স্থাপন হয়। অপরদিকে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইরাকের বিস্তারবাদ ও অনমনীয় আচরণে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে সাদ্দাম হোসেন ইরানে সৈন্য পাঠালে বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম যুদ্ধের সূচনা হয়, অবশেষে ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এ সংঘাতের অবসান হয়। ১৯৯০ সালে ইরাক আবার কুয়েত দখল করে নেয় এবং উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েত দখলমুক্ত হয়। এভাবেই বিস্তারবাদের বিষাক্ত বাতাসে বারবার বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব দূষিত হয়েছে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আধুনিক পৃথিবীর বিকাশ, যার ঢেউ লাগে সমগ্র বিশ্বে। ধারাবাহিকভাবে ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, জার্মান বিপ্লব, চীন বিপ্লব, কিউবান বিপ্লব, অরেঞ্জ বিপ্লব প্রভৃতি অসংখ্য বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও বিকাশ সাধিত হয়। পাশাপাশি এই উন্নতির ঢেউ লাগে সামরিক ক্ষেত্রেও, যা প্রতিনিয়ত পৃথিবীর বিকাশের পরিবর্তে মহাপরাক্রমে তার বিনাশের হুমকি তৈরি করে চলেছে। তাই আধুনিক বিশ্বের সভ্য সমাজের প্রতিটি দেশকে আরো সহনশীল ও নমনীয় আচরণ তৈরিতে উদ্যোগী হয়ে প্রাচীন বিস্তারবাদের ধ্বংসাত্মক নীতি পরিহার করে সর্বোচ্চ আধুনিক বিকাশবাদের নীতি গ্রহণ করা শ্রেয় বোধ করি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়