যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, আত্রাইয়ের পানি বিপত্সীমার অনেক ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির প্রচণ্ড চাপে অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে পড়েছে। মানুষজনের ভোগান্তির শেষ নেই। অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
জামালপুর : দ্বিতীয় দফা বন্যায় সাত উপজেলার পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টায় ১৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ১২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। দেওয়ানগঞ্জ বাজারে রেলস্টেশনে পানি ওঠায় ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি ইসলামপুর পর্যন্ত চলাচল করবে। কিন্তু পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জামালপুর থেকেই ট্রেন ঢাকা ফেরত যাবে। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নের মণ্ডল বাজারের অদূরে পাকা রাস্তাটি নদীতে বিলীন হচ্ছে।
জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী, বকসিগঞ্জ ও জামালপুর সদর সাতটি উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৪০টি ইউনিয়নের বিশাল এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইসলামপুরে বন্যার পানিতে ডুবে কটা মণ্ডল নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল পানির তোড়ে ভেঙে গেছে মাদারগঞ্জ-মাহমুদপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের লালডোবা গ্রামের ৫০ মিটার অংশ। আশপাশের ১০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়ে পড়েছে।
সিংড়া (নাটোর) : আত্রাই, গুরনই নদীর বন্যার পানির তীব্র স্রোতে সিংড়া উপজেলার শেরকোল ইউনিয়নের শাহবাজপুর-তাজপুর-তেমুখ নওগাঁ সড়কের তিনটি স্থান ভেঙে হুহু করে পানি ঢুকছে শেরকোল ও তাজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত নদীর পানি বিপত্সীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সড়কের অন্যান্য দুর্বল অংশও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শেরকোল ও তাজপুর ইউনিয়নের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষকে সতর্ক করতে জেলা প্রশাসনসহ সব সরকারি দপ্তরে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছে পাউবো। বুধবার বিকালে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ১১৬ সেন্টিমিটার ও ঘাঘটের পানি বিপত্সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বুধবার ভোরে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের ভাষারপাড়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চুঁইয়ে পানি ঢুকে গর্ত সৃষ্টি হয়। এতে বাঁধের পশ্চিম পাশে বসবাসকারী ৩০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
এছাড়া গাইবান্ধা সদরের খোলাহাটি ইউনিয়নের কিশামত বালুয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ায় তা হুমকির মুখে পড়েছে। অপরদিকে ফুলছড়ির মাঝিপাড়া এলাকায় ও গাইবান্ধা সদরের তালতলার বিপরীতেও বাঁধ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সাঘাটা উপজেলার ভরতখালি ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল আজাদ শীতল জানান, সাঘাটার ভরতখালী-কচুয়াহাট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকিতে রয়েছে।
কুড়িগ্রাম : নাগেশ্বরীতে ১০ ইউনিয়নের ৪৮টি গ্রাম সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। চিলমারীতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল চিলমারী পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার ১ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর : তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) : যমুনায় পানি ২৪ ঘণ্টায় ২৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপত্সীমার ১১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। যমুনার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। উপজেলার কর্ণিবাড়ী থেকে কামালপুরের গোদাখালি পর্যন্ত আট কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে পানি ঢুকছে।
সিলেট অফিস : বুধবার দুপুর ১২টায় সুরমার কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপরে, আমলশীদ পয়েন্টে কুশিয়ারার পানি ৩০ সেন্টিমিটার এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সুরমা-কুশিয়ারা-সারি ও লোভার বাকি সবকটি পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার বেশ কয়েক সেন্টিমিটার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। নদী তীরের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৩৭টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। ১৯-২০ জুলাই নাগাদ ভারী বর্ষণসহ আরেক দফা বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ : বুধবার সকালে সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ অবস্থায় জেলার চরাঞ্চল কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী ও সদর উপজেলার বানবাসি দেড় লক্ষাধিক মানুষ এখন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
নওগাঁ : মান্দা, রাণীনগর ও আত্রাইয়ের অন্তত ১০ স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। নওগাঁ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদীর পানি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পড়েছে।