চিরচেনা কবি আহসান হাবীব

চল্লিশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি আহসান হাবীব। কবিতাচর্চা আর লালনের পাশাপাশি তিনি গল্প-উপন্যাস-নাটক লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন অন্য ভাষার কবিতা। সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে আজো তিনি অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কবিতাশিল্পের জন্য তাঁর আকুলতা আর এ পথে পথিক কিংবা সহযাত্রী তৈরিতে তিনি ছিলেন অফুরান অনুপ্রেরণার উত্স। ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুরের শঙ্করপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি আহসান হাবীব; এই পৃথিবী থেকে চিরতরে তিনি বিদায় নেন ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই।

ইতিহাস-সভ্যতা-অগ্রগতি আর ভবিষ্যত্-প্রজন্মের নিবিড়কথন তাঁর ‘আমার সন্তান’ কবিতাটি। পিতার গর্ব—বর্তমান-প্রজন্মের কর্মযোগ ও অর্জন এই কবিতার ক্যানভাস। কবিতাটিতে চিন্তা-স্বপ্ন আর আশাবাদের প্রেরণা আছে; আছে পথ-নির্মাণের দায় ও দায়িত্বের ঘোষণা। তাঁর ভাষ্য : ‘আমার সন্তান যায়/হেঁটে যায়/সামনে যায়/দেহ তার দীর্ঘতর হয়। আরো দীর্ঘ/সন্তানের দেহ/পিতার গর্বিত বুক উঁচু কাঁধ প্রশস্ত ললাট/ছাড়িয়ে সে আরো দীর্ঘতর হয়ে/আমার হাতের/নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে ছুটে যায়।’

স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতাকে বরণ করার, তাকে নানান সাজে সাজানোর অপেক্ষা আর স্বাধীনতার সুখ অনুভবের তীক্ষতা কবিকে কল্পনার মায়াবী ভুবনে হাজির করে যেন; তিনি আকাশ দেখার মতো ভালোলাগার অনুভবে তৈরি করেন কবিতার সতেজ শব্দরাজি : ‘শব্দের মালায় আমি তোমাকে গাঁথতে চাই— স্বাধীনতা! তুমি/ঘরে-বাইরে এমন উলঝলুল নৃত্যে মেতে আছো, কি আশ্চর্য/আমার কলম/কিছুতেই তোমাকে যে ছুঁতেও পারে না।...মানুষকে ডেকে ডেকে  বলি, এসো/স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে/আমরা সোচ্চার হয়ে আকাশকে সচকিত করে তুলি/আর হাওয়ায় ছড়াই কিছু নতুন গোলাপ,/দেখি জানালায় ঝুলে আছে নীলাকাশ/সামনের বাগানে/গোলাপ। বুকের মধ্যে/তুমি/মনোহর শব্দমালা।’ (স্বাধীনতা)। স্বাধীনতার সুখ-প্রশান্তি আর এগিয়ে চলার সামর্থ্য যেন কবিকে জাগিয়ে তোলে অবিরাম হাঁটার নেশায়। হাবীব স্থির বসে থাকার মতো মানুষ ছিলেন না; দেহকে টেনে টেনে হয়তো খুব বেশি দৌড়াননি তিনি, তবে মানসিকভাবে এগিয়ে চলার বাসনায় ছিলেন প্রখর-চেতন। তিনি অনুভব করতেন—থেমে থাকার জায়গা নয় এই পৃথিবী। ভাষা-বিজ্ঞান-গণিত-প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ঐতিহ্যের আলোয় অনাগতের পথে ধেয়ে চলাই যে জীবনের ধর্ম, তা তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তিনি জানাচ্ছেন :

কথা বলতে বলতে এসো এখন এগিয়ে যাই,

এখন কথা বলার সময়।

দেখো

স্টেশনে এখন টিকেটঘর খোলা

এসো টিকেটগুলো কিনে নিই

খোলা কামরায় ভিড়

এসো ভিড়ের মধ্যে মিশে যাই

এসো গলা মিলিয়ে গান গাই

আমাদের যাত্রা হলো শুরু। (কথা বলতে বলতে)

 

‘ভাবনাহীন দৈনন্দিন সহজ জীবন’ অন্বেষায় কেটেছে হাবীবের সারাপ্রহর। দেখেছেন ঘরে ঘরে সুগন্ধি ছড়ানো; যদিও সংসারী নেই আদতে কোনো সংসারে। ‘বীরত্বের মহড়া’ আর আসামি শনাক্তকরণে অসতর্কতা ও ভীতিপ্রবণতা যে সমকালের অন্যতম অসুখ, তা তিনি টের পেয়েছিলেন। আমাদের সামর্থ্যের সীমানা-দেয়াল তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে পড়েছিল ক্রমান্বয়ে। বাঙালির বীরত্বের অহংকারের অন্তরালে যে বুক-কাঁপা স্বভাব লুকিয়ে রয়েছে, তা কি আর অনায়াসে ঢেকে ফেলা যায়? বিদেশপ্রীতি আর নিরর্থক বিভ্রান্তিতে পড়ে আমরা যে দিনদিন দেশলগ্নতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, সে ভাবনা কবিকে অবসন্ন করে তুলেছিল; ওই অপমানের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি খুঁজেছেন তিনি। আপন-ঐতিহ্যচ্যুতির লজ্জাকে কবিতার পাতায় পরিবেশন করেছেন এভাবে :

‘কত ধানে কত চাল’ এও প্রশ্ন, হায়রে কপাল!

ঢেঁকির খবর নিতে তোরা যাস বিলেতে; এদিকে

মা রয়েছে ঢেঁকিশালে আজীবন, কখনো সেদিকে

ফেরে না তোদের মন। কত ধানে হয় কত চাল

এই এক প্রশ্ন নিয়ে আজীবন হোস্ নাজেহাল। (উনিশ কি বিশ)

কবিতাটিতে নিজ সংস্কৃতির প্রতি প্রবল আকর্ষণের পাশাপাশি অঙ্কিত হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের, বিজ্ঞানের প্রভূত সাফল্যের এই সময়ে আমাদের পিছিয়ে-পড়ার ইতিবৃত্ত। অতঃপর তাঁর প্রতিবাদী চেতনা মানবসভ্যতার ঐতিহ্যানুসারী হয়ে পড়ে; আদিম সমাজের বিকাশ আর অগ্রসর-প্রবণতাকে আত্মস্থ করেন তিনি। প্রাচীন-বন্য মানবসমাজে পাথরে-পাথরে তীব্র ঘর্ষণ থেকে যে আগুনের ফুলকির উদ্ভব, সে আগুনের লেলিহান শিখায় তিনি জ্বালাতে চান সকল পাপ-যন্ত্রণা; সমাজের-রাষ্ট্রের গা থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে চান অপরাধের গ্ল­ানিবহর। পথের গায়ে, কালের গায়ে লেপ্টে-থাকা ধুলো-বালি ঝাড়তে ঝাড়তে তিনি এগিয়ে চলেছেন রোদপোহানো কোনো সকালের দিকে; যেন তিনি ‘স্মৃতিহরণের’ অপরাজেয় প্রতিদ্বন্দ্বী। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন কল্পনার ভুবন কামার, লক্ষ্মণ মুচি, মতি সওদাগর আর নীলমণি নদীকে। এখন শুধু প্রয়োজন যাবার জন্য টিকেট আর প্রহর-গোনার ধৈর্য। তাঁর প্রার্থনা-অভিপ্রায় :

আমি আমার সমস্ত যৌবন তার হাতে নিঃশেষ করে

মিনতি করেছি, আমার টিকেট দিন

আমার যাবার টিকেট দিন

শাদা নীল অথবা সবুজ

এমন কি ফ্যাকাশে হলুদ হোক তার রং

তবু একটা টিকেট আমার চাই। (অপেক্ষা)

প্রকৃতি—তার নির্মল শোভা, তার যাবতীয় দান-উপাদান আমাদের জন্য যে কী অশেষ রহমত, তা কবি আহসান হাবীব আমাদেরকে অনুধাবন করার পরামর্শ দিয়েছেন অভিভাবকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি থেকে শক্তিসঞ্চয়ের তাগিদও মতান্তরে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথা : ‘দেখে নে শ্যামল বিভা বনানীর/বনরাজিনীলা/এই পৃথ্বি/নদী/নারী/শস্যমাঠ চিনে নে, এবং/তারো আগে শত্রুর শিবির।’ (রে কিশোর)

আহসান হাবীব জানাচ্ছেন :

আমি কোনো আগন্তুক নই। এই

খররৌদ্র জলজ বাতাস মেঘ ক্লান্ত বিকেলের

পাখিরা আমাকে চেনে

তারা জানে আমি কোনো অনাত্মীয় নই।

কার্তিকের ধানের মঞ্জুরী সাক্ষী

সাক্ষী তার চিরোল পাতার

টলমল শিশির, সাক্ষী জ্যোত্স্নার চাদরে ঢাকা

নিশিন্দার ছায়া

অকাল বার্ধক্যে নত কদম আলী

তার ক্লান্ত চোখের আঁধার

আমি চিনি, আমি তার চিরচেনা স্বজন একজন। আমি

জমিলার মা’র

শূন্য খা খা রান্নাঘর শুকনো থালা সব চিনি

সে আমাকে চেনে।

হাত রাখো বৈঠায় লাঙলে, দেখো

আমার হাতের স্পর্শ লেগে আছে কেমন গভীর। দেখো

মাটিতে আমার গন্ধ, আমার শরীরে

লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস।

আমাকে বিশ্বাস করো আমি কোনো আগন্তুক নই।

এই অস্তিত্বের সংকট উত্তরণ-প্রচেষ্টার প্রহর পেরিয়ে তিনি প্রবেশ করেছেন আরেক সমস্যায়। স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের সংকট এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর সামনে; জাতির সামনে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্বাধীনতা-সংগ্রাম আর দেশগড়ার আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ নেতৃবৃন্দ যখন ঘাতকের বুলেটের আঘাতে নিঃশেষ হয়ে গেলেন, তখন হাবীব যেন বাংলাদেশি-বাংলাভাষীর মাথার ওপর থেকে বটবৃক্ষের ছায়া সরে যেতে দেখলেন। আর তখন তাঁর ‘পরিক্রম এবং অবস্থান প্রসঙ্গ’ প্রকাশ করা জরুরি হয়ে পড়ল। শেষ কবিতাগ্রন্থ ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’-এ তিনি লিখলেন : ‘বণ্টনবৈষম্য, সামাজিক অসাম্য, পরাধীনতা, স্বাধীনতা সংগ্রাম/এবং মহাযুদ্ধের দায় এই সবই সমগ্র রাত্রিশেষের উপজীব্য।/উত্তরতিরিশ কবিতার সমাজ সচেতন অধ্যায়ে নিজের সংলগ্নতা আমি/এভাবেই এই সময়ে আবিষ্কার করি।/তারপর ক্রমান্বয়ে ছায়াহরিণ, সারাদপুর, আশায় বসতি/মেঘ বলে চৈত্রে যাবো, দু’হাতে দুই আদিম পাথর এবং প্রেমের/কবিতা। শ্রেণীবৈষম্যের অভিশাপ, মধ্যবিত্ত জীবনের কৃত্রিমতা/এবং উদ্ভ্রান্ত উদ্বাস্তু যৌবনের যন্ত্রণা এই সবই আজো/পর্যন্ত আমার কবিতার বিষয়বস্তু। এক শ্রেণীর মানুষের কৃত্রিম/জীবনতৃষ্ণা তাদের নীচ জীবনাচরণের প্রতি ব্যঙ্গবাণ—এইসব।/সুধীজনদের কেউ কেউ বলেন, বলতে বলতে চালু হয়ে/গেছে, আহসান হাবীব মৃদুভাষী কবি। কবিতায় মৃদুভাষিতা কি/জিনিস আমি কিন্তু বুঝি না। ভালা কবিতা আর মন্দ/কবিতা বুঝি, সার্থক রচনা আর অসার্থক রচনা বললে বুঝি।’ (পরিক্রম এবং অবস্থান প্রসঙ্গ)

 

পৃথিবীখ্যাত কবি সিলভিয়া প­াথ আত্মহননকে উপভোগ করেছিলেন। নিজের বাড়িতে রান্নাঘরে দরোজা বন্ধ করে আগুন জ্বালিয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন; মরার যন্ত্রণা আর আনন্দকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু কেন এই ইচ্ছামুত্যু! কেন মরেছিলেন মায়াকোভস্কি! জীবনানন্দও কি আত্মহত্যা করেছিলেন!; তাঁর ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় বর্ণিত আপাত সুখী মানুষটিকে মরতে হলো কেন! এই সব অব্যাখ্যায় মৃত্যুর সঠিক হিসাব কি পাওয়া আদৌ সম্ভব! মৃত্যু কি কোনো উত্সবের ছদ্মনাম! চাঁদ কিংবা আকাশ কিংবা বৃষ্টি দেখলে আমাদের মন ভালো অথবা খারাপ হয় কী কারণে!—কবি আহসান হাবীব এইসব অধরা-বিশ্লে­ষণঅযোগ্য বিষয়াদিতে নিমগ্ন হয়ে পড়তেন মাঝে মাঝে। তারই সামান্য নিদর্শন :

মানুষ এখন দেখো মানুষের সঙ্গ ছেড়ে কেবলি পালায়

মানুষের মধ্যে থেকে প্রতিটি মানুষ দেখো কি সহজে একা হয়ে যায়!

কেন যায়, কেন প­াথ আত্মহননেই খোঁজে মুক্তি, কেন দক্ষিণ বাংলার

ভোলার পুরনো এক ডাকঘরের বারান্দায় ক্লান্ত দেহভার

মেলে দিয়ে এক দীপ্র অষ্টাদশী হল্যান্ডবাসিনী

অঘোরে ঘুমায় একাকিনী, যার

ঘর ছিলো, ছিলো দুগ্ধফেননিভ শয্যার আশ্রয় আর

বিস্তৃত খামার আছে পিতার এবং তার ফলের বাগান

পাখির ক্ষুধার্ত মুখে তুলে দেয় উত্সবের গান? (উল্টোপাল্টা এইসব)

গৌতম বুদ্ধের আদর্শের পলিমাটির স্নেহমাখা এই জনপদ আজ যেন অশুদ্ধ বাতাসে পরিপূর্ণ। মানুষে মানুষে নেই সম্প্রীতির বন্ধন; চারদিকে কেবল অশুভ-প্রবণতা আর ছলচাতুরির ছড়াছড়ি। অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখা, মমতা দিয়ে অনুভব করার ফলে কবি হাবীব দূরে থাকতে পারেননি বাংলাদেশের মাটির মমতারস থেকে। আর তাই তাঁর উপস্থিতি এবং দায়িত্বও যেন কষ্টবর্ণনাকারী হিসেবে। তিনি লিখেছেন : ‘অশুদ্ধ মানুষ খুব বেড়ে গেছে/সারিবদ্ধ স্নানার্থী মানুষ/মরা নদী মরা স্রোত ছাড়িয়ে এখন—/বলে দাও/যেতে হবে অন্য কোনো নিরঞ্জনা নদীর সন্ধানে।’ (এইখানে নিরঞ্জনা)

আহসান হাবীব তত্কালীন পূর্ববাংলা—বর্তমান বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি। তিনি বিভ্রান্তি-বিবরণের কবি; জীবনের আঁধার-আলোক তাঁর কবিতার বিষয়াবলি। সকল প্রতিকূলতা আর পঙ্কিলতার স্তূপের আড়ালে তিনি সম্ভাবনার মঞ্চ তৈরি করতে আগ্রহী এবং আগ্রহ জাগাতে উত্সাহী। এ ভূখণ্ডের জাতীয় চেতনার প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বস্ততা আর এ অঞ্চলের মানুষের অধিকার-মর্যাদা এবং স্বপ্নবিভোরতা বিবরণের কবি। তাঁর কবিতাশিল্পের মহিমা ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা, শিল্পের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর প্রজন্ম-প্রহরনিবিড়তা আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বহুকাল।

আহসান হাবীব, ২ জানুয়ারি ১৯১৭—১০ জুলাই ১৯৮৫