দেশের চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমছে প্রতিযোগিতার হারে। প্রতিবছর শেষে মুক্তি পাওয়া সিনেমার সংখ্যাটা নিচের দিকেই নামছে। এ নিয়ে আলোচনারও কোনো কমতি নেই। সিনেমার প্রযুক্তির জায়গা থেকে অনেকে উন্নতির দিকে নজর দিলেও সেটি নূন্যতম প্রচেষ্টা মাত্র। অথচ এফডিসির ভেতরের সংগঠনগুলোর কোন্দলের কমতি নেই। বিশেষ করে চলচ্চিত্রশিল্পী সমিতি বিভিন্ন সময় যেমন আলোচনায় আসে তেমনি বিতর্ক উঠে এসেছে কয়েকবার। নির্বাচন থেকে শুরু করে এর কার্যক্রম নিয়ে তর্কে জড়িয়েছে সংগঠনটি। এবার শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে এফডিসির ১৮টি সংগঠন।
১৫ জুলাই এফডিসির জহির রায়হান কালার স্টুডিওতে এক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে সংগঠনগুলোর সিদ্ধান্ত জানানো হয়। যার নেতৃত্বে দেয় প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি। সম্মেলনের উপস্থিত ছিলেন পরিচালক সমিতির নেতা মুশফিকুর রহমান গুলজার, বদিউল আলম খোকন, প্রযোজক সমিতির নেতা খোরশেদ আলম খসরু, শামসুল হক, অভিনেতা ওমর সানী, প্রযোজক মো. ইকবালসহ অনেকে। প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলেন, ‘সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, লকডাউন শেষে এখন অনেকেই কাজে ফিরছেন। চলচ্চিত্র কর্মীদের অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে যে নীতিমালা করা হয়েছে, তা মানা জরুরি। না হলে নাজুক চলচ্চিত্র অতিরিক্ত ব্যয়ে আরো করুণ হয়ে যাবে। যদি এই নীতিমালা মানা হয় তাহলে চলচ্চিত্র থাকবে। আর না হয় আর কোনো চলচ্চিত্রই হবে না। তাই বলে কিছু ‘অযোগ্য’ শিল্পীর দিনের পর দিন এমন আচরণ বরদাশত করা হবে না।’ পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘জায়েদ খান প্রযোজক ও পরিচালকদের সম্মান করা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। তিনি তাদের হেয় করে কথা বলেন। প্রযোজক ও পরিচালকই নয়, অনেক শিল্পীকেও তিনি নানাভাবে অপমান করেছেন। তিনি অনেক শিল্পীকে এসএমএস করে আমাদের তৈরি নীতিমালা না মানতে উত্সাহিত করেছেন। সব মিলিয়ে তাই আমরা সবাই মিলে জায়েদ খানকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চলচ্চিত্র নির্মাণে শৃঙ্খলা আনতে ও নির্মাণ ব্যয় কমাতে গত অক্টোবরে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে প্রযোজক সমিতি। এটি বাস্তবায়ন হলে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ নূন্যতম ১৫ লাখ টাকা কমে যাবে। বিষয়টি নিয়ে একটি শুটিং ফ্লোরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটান মিশা সওদাগর। তখন প্রযোজক সমিতি তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়। এটা লকডাউনের আগের ঘটনা। তখন জানানো হয়, প্রযোজক সমিতির কোনো সদস্য মিশাকে নিয়ে কোনো ছবি করবেন না বা তাকে নিয়ে কেউ অনুমোদন নিতে এলে, তার ছবিটি অনুমোদন করা হবে না। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবত্ আছে।’ পরিচালক সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘শিল্পী সমিতির নেতাদের অনেকবার মিটিংয়ে আসতে বলেছি আমরা। শিল্পী সমিতির নির্বাচনের কারণে তারা আসতে পারেননি। এমনকি কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠাননি তারা। নীতিমালা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে আমরা কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে মিশাকে নীতিমালার বিষয়টি বোঝাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু মিশা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এটা ব্যক্তিগত বিষয় না। বিতণ্ডার ঘটনার পরপরই ১৮ সংগঠনের তরফ থেকে মিশাকে কারণ দর্শানো নোটিস পাঠানো হয়। মিশা এটিকে অতি উত্সাহী কাজ বলে অভিহিত করছেন। আলমকে পিকনিকের কার্ড দিয়েছিলেন। উনি কার্ড নেননি ও পিকনিকে যাননি। এটার জন্য তার সদস্যপদ বাতিল করেছে শিল্পী সমিতি। হাস্যকর ব্যাপার। কোনো কারণ নেই। সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনা করে সংগঠনগুলো এক হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
মিশা সওদাগর সার্বিক বিষয় নিয়ে বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে এমন ঘটনা কারো কাছে প্রত্যাশিত নয়। আমি চাই, একে অপরকে বয়কট না করে আমরা ছবি করি। ব্যক্তি স্বার্থে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্রের অবস্থা আরো খারাপ না করি। আমাদের মিলেমিশে কাজ করা উচিত। আমি সমঝোতার পক্ষে। নীতিমালায় শিল্পীদের কনভেন্স বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু শিল্পীদের অনেকে কনভেন্সের ওপর নির্ভর করে। শিল্পীদের কনভেন্স লাগবে। আমার সঙ্গে কারো কোনো বৈরিতা নেই। আমরা ভুল করলে সেটা তাদের বিবেচনার মধ্যে থাকবে। এখানে ঝগড়ার কিছু নেই। মারামারিরও কিছু নেই। আশা করছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
জায়েদ খান বলেন, ‘এফডিসিতে আমার অনেক গুরুজন রয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে সেগুলো কিন্তু আমার সংগঠনের সিনিয়র কেউ করেননি। শুধু মুখে বললে হবে না, অভিযোগের প্রমাণ দিতে হবে। অভিযোগ তোলা সহজ। কাজ করা খুব কঠিন।’
এফডিসির সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কোন্দল বছরের পর বছর চলছে। কিন্তু যে কাজের জন্য এই সংগঠনগুলো তৈরি করা হয়েছে তা নিয়ে কোনো ধরনের উল্লেখযোগ সফলতা নেই কোনো সংগঠনের। শিল্পী সমিতি যেমন তাদের নির্বাচন, পিকনিক, মিলাদ নিয়ে সারাবছর কাটিয়ে দেয় তেমনি অন্যান্য সংগঠনগুলোও গত কয়েকবছরে চলচ্চিত্রের উন্নয়নে তাদের কোনো পদক্ষেপ নিয়ে কোনো সংবাদ সম্মেলন বা আলোচনায় নেই। অথচ দর্শকরা দিনশেষে একটি ভালো সিনেমা দেখার অপেক্ষায় থাকে। এমনিতেই দেশের হলগুলোর করুণ অবস্থা। সিনেমা কমায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক সিনেমা হল। কিন্তু এফডিসির সংগঠনগুলোর দায়িত্বের জায়গায় ঘাটতি দেখা গেছে বহুবার।
সিনেমা সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা এসব কোন্দল দূর করে সিনেমার উন্নতি নিয়ে চিন্তা করা হোক। দিনদিন এমন পিছিয়ে যাওয়া থেকে ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে সামনের দিকে এগুতে পারে সেটিই হওয়া উচিত সংগঠনগুলোর মূল কাজের জায়গা।