রাজা সীতারাম :ইতিহাস থেকে পাঠ

অনেক দেশে কিংবা অঞ্চলে জন্ম হয় ইতিহাস সৃষ্টিকারী কিছু ব্যক্তিত্বের। এমন এক জন ঐতিহাসিক পুরুষ রাজা সীতারাম রায়। দক্ষিণবঙ্গের যশোর-খুলনা অঞ্চলে তার আবির্ভাব হয়।

শাহজাহানের পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণ করেন ১৬৫৮ সালে। আপন ভাই শাহ সুজার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের যুদ্ধ চলাকালে বাংলার দক্ষিণাংশে আবির্ভূত হন সীতারাম রায়। তার পিতা উদয়নারায়ণ রাজমহলে নবাব সরকারের চাকরি করতেন। রাজমহলে থাকার সময় বর্তমান বর্ধমান জেলার কাটোয়ার মহিপতি গ্রামের কুলীন কায়স্থের কন্যা দয়াময়ী দেবীকে তিনি বিয়ে করেন। দয়াময়ীর গর্ভে জন্ম হয় সীতারাম রায়ের। সীতারামের শৈশব কাটে মাতুলালয়ে। পড়ালেখাও সেখানে।

সীতারামের পিতা উদয়নারায়ণ শায়েস্তা খাঁর আমলে রাজমহল থেকে প্রথমে ঢাকায় এবং পরবর্তীকালে রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তা বা তহশিলদার হিসেবে ভূষণায় আসেন। আগে ভূষণা ছিল বারোভুঁইয়ার অন্যতম ভুঁইয়া মুকুন্দরাম রায়ের রাজ্য। এরপর ভূষণা মোগলদের অধীনে এলে ভূষণায় এক জন ফৌজদার নিযুক্ত হন। সে সময় ভূষণায় উদয়নারায়ণ নিজের কাছে আনেন পুত্র সীতারামকে। মধুমতী নদীর তীরে সুন্দর নগরী ছিল ভূষণা। এটি ছিল এ এলাকার রাজধানী। খুবই সমৃদ্ধ নগরী ছিল। প্রাচীন এই নগরীর এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন দেখা যায়। রাজকার্যের জন্য উদয়নারায়ণের ভূষণায় আবাস থাকলেও পরিবারবর্গের জন্য বর্তমানে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার গুণাবহা ইউনিয়নের হরিহরনগরে তার স্থায়ী বাসভবন ছিল।

নবাব নিয়োজিত ফৌজদারের অধীনে তার রাজ কর্মচারী ছিলেন উদয়নারায়ণ। ফৌজদার বৃদ্ধ ও অকর্মণ্য থাকায় এলাকায় ফৌজদারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিল না। সাধারণ মানুষের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। ডাকাত, মগ জলদস্যু, পর্তুগিজ দস্যুদের অত্যাচারে প্রজারা অতিষ্ঠ ছিলেন। ভূষণা বর্তমানে ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার সদর দপ্তর থেকে কিছু দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। তখন কলকাতা নগরী গড়ে উঠেনি। স্থানীয় যুবকদের নিয়ে সীতারাম রায় মধুমতী নদীতে সাঁতার কাটতেন। সাঁতার, অশ্ব চালানো, তরবারি চালানো, লাঠিখেলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সে সময় রাজকার্য পেতে হলে এসব যোগ্যতার প্রয়োজন হতো। বর্ধমান থেকে আসা এই তরুণ ভাটির দেশের পলিমাটির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন।

রাজকার্যের প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকায় যেতেন উদয়নারায়ণ। সঙ্গে নিয়ে যেতেন পুত্র সীতারামকে। সীতারাম শক্তিশালী যুবকে পরিণত হওয়ার পর তার পিতার পরামর্শে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য সুবেদার শায়েস্তা খাঁর কাছে যান।

ভূষণার পাশেই ছিল সাতৈর পরগনা। মোগলেরা আসার আগে এ অঞ্চলে পাঠানদের শাসন ছিল। ক্ষমতা থেকে পাঠানরা চলে যাওয়ার পরও কিছু কিছু এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়ে যায়। তার মধ্যে ছিল সাতৈর। সাতৈর তখনো পাঠানমুক্ত হয়নি। সাতৈরের জায়গিরদার ছিলেন এক জন পাঠান। নাম ছিল করিম খাঁ। তাকে কেউ পরাজিত করতে পারত না। ভূষণার অকর্মণ্য ফৌজদার কয়েকবার সাতৈরে আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। মোগলরা সিদ্ধান্ত নেন, যে কোনো মূল্যে সাতৈরের দখন নিতে হবে। শায়েস্তা খাঁ ঘোষণা দেন, সাতৈরের জায়গিরদার করিম খাঁকে যে পরাজিত করতে পারবেন, তাকে ঐ পরগনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। তখন যুবক সীতারাম এগিয়ে আসেন। তিনি যুদ্ধ করতে যাওয়ার কথা জানালে শায়েস্তা খাঁ তাকে হাজার হাজার পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য, কামান, বন্দুক দিয়ে সেখানে পাঠান। সীতারামের সঙ্গী হন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মন্ত্রণদাতা মুনিরাম রায় আর অসীম শক্তিধর রঘুরাম ঘোষ ওরফে মেনাহাতী। যুদ্ধে করিম খাঁ পরাজিত ও নিহত হন। শায়েস্তা খাঁ সীতারামকে সাতৈর বা নলদীর পরগনার জায়গিরদার হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি চলে আসেন হরিহরনগরে। তার জমিদারি সুসংহত করার জন্য কাজে নেমে পড়েন। যথারীতি পরামর্শদাতা মুনিরাম ও শক্তিমান রাঘুরামকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। আসার পথে তার সঙ্গে যোগ দেন বক্তার খাঁ, আমল বেগ নামে এক জন মোগল সেনানী এবং নিম্নবর্ণের কিছু লোক। তার মধ্যে ছিলেন রূপচাঁদ ঢালী। তিনি ছিলেন নমঃশূদ্র। আরেক জন ছিলেন ফকিরা মাছকাটা। তিনি ছিলেন নিকারি। সে সময় শারীরিক সামর্থ্যে শক্তিমান হলে তার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল। সীতারাম সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলে খবর পেয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বলশালী লোকজন যোগ দেন। খুব শিগিগরই শক্তিশালী বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কাজে তিনি কার্পণ্য করতেন না। যেখানে সে সমস্যা ছিল, তা নিরসন করতে থাকেন। চোর-ডাকাত, পর্তুগিজ দস্যু, মগ জলদস্যুদের কঠোরহস্তে দমন করেন। আরাকান থেকে আসা জলদস্যু ধর্মদাস মধুমতী-গড়াই নদীর সংযোগস্থল খুলুমপুরে একটা এলাকা দখল করে নিয়ে জায়গির প্রতিষ্ঠা করেন। তাকেও উত্খাত করেন। এসব কারণে তার সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় যে শাসকের এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা ভালো এবং সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকত, সাধারণ প্রজারা সেখানে বসতি স্থাপন করতেন। সীতারামের রাজ্যে ছুটে আসতে থাকেন ব্যবসায়ী এবং প্রজারা। সুশাসনের এ খবর দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং মুর্শিদাবাদের নবাবের কানেও যায়। সীতারামের রাজত্বের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে।  ছোটবেলায় ভূষণায় থাকাকালীন ইদিলপুর নিবাসী গরিব কায়স্থ এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে সীতারামের বিয়ে হয়। পরবর্তীকালে তার সঙ্গে কোনো সংস্রব ছিল না। জায়গিরদার হওয়ার পর বীরভূম জেলার দাসপলসা গ্রামের কুলীন কায়স্থ সরল খাঁ ঘোষের কন্যা কমলাকে তিনি বিয়ে করেন। তৃতীয় বিয়ে করেন বর্ধমান জেলার পাটুলি গ্রামের এক কুলীন কায়েস্থর কন্যাকে। তিন স্ত্রী থাকলেও প্রথম জনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। ১৬৮৬ সালে পিতার পরলোকগমন করার পর সীতারাম পরামর্শদাতা মুনিরাম ও রামরূপকে সঙ্গে নিয়ে পিণ্ডদানের মাধ্যমে পিতশ্রাদ্ধ করার জন্য গয়াধামে যান। বাবার পিণ্ডদান করে সোজা চলে যান দিল্লি। সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজসভা থেকে রাজ উপাধির সনদ নিয়ে আসেন। এরপর ঢাকায় গিয়ে সুবাহদার শায়েস্তা খাঁর সম্মতি নিয়ে হরিহরনগরে ফিরে আসেন। রাজা উপাধি পাওয়ায় এলাকায় আনন্দ-উল্লাস করা হয়। রাজা উপাধি পেলেও তার কোনো রাজধানী ছিল না। তখন তিনি রাজধানী স্থাপন করার চিন্তা করেন।

সীতারাম তার রাজত্বে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। পাবনা পর্যন্ত তার রাজত্বের সীমারেখা বর্ধিত হয়। দক্ষিণে সুন্দরবন পর্যন্ত। যশোরের চাঁচড়ার জমিদাররা একবার তার এলাকায় আক্রমণ করে। সীতারামের পরাক্রমের কাছে তারা পরাভূত হয়। সীতারাম পালটা চাঁচড়া আক্রমণ করলে তারা বশ্যতা স্বীকার করে তার অধীন হয়। তিনি সমৃদ্ধ একটি রাজত্ব গড়ে তোলেন। ১৬৮৬ সালে রাজ উপাধি পেলেও ১৬৯৯ সাল থেকে তিনি স্বাধীন রাজার মতো চলতে থাকেন। তিনি মোগলদের কর দেওয়া বন্ধ করে দেন। দিল্লির অধীনতা অস্বীকার করতে থাকেন। স্বাভাবিকভাবে তারা বিক্ষুব্ধ হন।

প্রায় ২০০ বছর আগে রাজা সীতারাম রায় পরলোকগমন করলেও তার  কীর্তি এখনো অমলিন হয়ে আছে। তিনি দক্ষ শাসক হিসেবে প্রশংসিত হন। তিনি জনগণের মন জয় করে নিতে সক্ষম হন। তার উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে—তিনি এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। কঠোরহস্তে চোর-ডাকাত, জলদস্যু দমন করেন। অনেক জনহিতকর কাজ তিনি করেন। সে সময় জলকষ্ট দূর করা একটা মহত্ কাজ ছিল। এলাকাবাসীর সুপেয় জল পাওয়া খুবই দুষ্কর ছিল। সবাই নদী-নালা, খাল-বিলের জল পান করতেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় জলাশয় বা দীঘি খনন করেন। তার যেখানে রাজত্ব ছিল সেখানকার অধিকাংশ স্থানে দেখা যায়, সীতারাম রাজার পুকুর বা রাজার পুকুর।

পাবনা থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত দক্ষিণ বাংলার এই বিস্তীর্ণ এলাকার রাজা ছিলেন রাজা সীতারাম রায়। মহম্মদপুর ছিল এই রাজ্যের রাজধানী এবং এক সমৃদ্ধ নগরী। মহম্মদপুরের সেই গৌরবজনক অধ্যায় এখন আর নেই। রাজা সীতারামের আমলের রাজবাড়ীর কাছারিবাড়িটি আজও অক্ষত আছে। ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে অনেক দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার জন্য মহম্মদপুরে আসেন। জনহিতকর রাজা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে মহম্মদপুরের রাজা সীতারাম রায়ের নাম। সে নাম কখনো মুছে যাবে না।

n লেখক : সাবেক প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়