বলবান জামাতার কাণ্ড

g  জাহিদ হাসান শিশির

 

লোকে বলে ভাগ্যই নাকি সবকিছু। বাবুল সাহেবের বেলায় তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে। বাবুল সাহেব যেমন প্রচণ্ড সম্পদশালী মানুষ তেমনি তার জামাতাও প্রচণ্ড বলশালী মানুষ। একেবারে খাপে খাপ। বাংলা প্রবাদের ভাষায় যাকে বলে ‘সোনায় সোহাগা’।

এমন সোনায় সোহাগা জামাতা পেয়েও বাবুল সাহেবের একটি বিষয় নিয়ে আক্ষেপ আছে। জামাতা এক কানে শোনে না। তাকে একটা বললে আরেকটা শোনে। অত্যন্ত শক্তিমান জামাতা পেয়েও এই একটুখানি গলদে গাঁজন নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম। জামাইকে তিনি যদি বলেন সামনে যেতে সে পেছনে চলে যায়। খালা বললে শালা শোনে। পুরোই বিদঘুটে অবস্থা।

আসলে কিছুদিন আগেও জামাতার এই বেহাল অবস্থা ছিল না। এই অবস্থা ঘটেছে এক রাজনৈতিক গুরুর চড় খেয়ে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামাতার সেই রাজনৈতিক গুরু তাকে তার কানের ওপর সজোরে চড় মারে। সেই থেকে তার এক কানে শোনাশুনি বন্ধ। গুরুর হাতে যে বলবান জামাতার চাইতেও বেশি বল আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তা না হলে তো আর গুরু হওয়া যায় না।

কথা সেটা না। কথা হচ্ছে, সেদিন থেকে জামাতা নিজেও সেই চরিত্র ধারণ করেছে। সে এখন যাকে হাতের কাছে পায় তাকেই তুচ্ছ ঘটনায় চড় মেরে দেয়। এখন পর্যন্ত ৯৯ জনকে চড় মেরেছে সে। আরেকটা মারতে পারলেই সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে।

বাবুল সাহেবের সাথে সেদিন আমার দেখা হলো সকালবেলা। তিনি তখন সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছেন। আমাকে দেখে তিনি পত্রিকাটা চোখের সামনে থেকে নামিয়ে রাখলেন। বললেন, ‘বসো, আমি তোমাকে ডেকেছিলাম, কারণ আমি একটা বড় সমস্যায় ছিলাম। এখনো আছি। সমস্যাটার কোনো সমাধান হয়নি, সমাধান প্রয়োজন। তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। আশা করি তুমি পারবে।’

বললাম, ‘সমস্যাটার পুরোপুরি খুলে বলুন দেখি কিছু করতে পারি কি-না।’

তিনি মাথা নিচু করে বললেন, ‘আমার জামাতা বড়ই ভালো মানুষ। সবার সাথে ভালো ব্যবহারই করে। কিন্তু তার বাজে স্বভাব হচ্ছে সে সহজেই রেগে যায়। আর মানুষকে চড় মারে। তার এই চড় মারার স্বভাবের কারণে আমার মান-সম্মান যায় যায় অবস্থা। তার হাত থেকে এলাকার কেউই নিস্তার পায়নি। এখন তার এই খারাপ অভ্যাসটা দূর করার কোনো উপায় আছে কি-না, থাকলে বলো।’

আমি বললাম, ‘বড়ই জটিল সমস্যা। সমস্যার মূল যেখানে সেখানেই নির্মূল করতে হবে। আপনার জামাতার সাথে আগে কথা বলি। তারপরে ভেবে দেখি কী করা যায়।’

বাবুল সাহেব অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, ‘সোজা ছাদে উঠে যাও। সে এখন সেখানেই আছে। তাকে বেশি ঘাটাবে না। ঘাটাঘাটি তার পছন্দ না।’

আমি চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলাম। ছাদে উঠে আমি অবাক। সেখানে সে নেই, মোনালিসা একাকী দাঁড়িয়ে আছে। মোনালিসা বাবুল সাহেবের ছোট মেয়ে। আমার সাথে তার এত বেশি চেনা-জানা নেই। আমি তাকে কিছু বলতে যাবো এর আগেই সে বললো, ‘ভাইয়া, আপনি ভীষণ বোকা। আপনাকে বাবা যা বলে তাই আপনি করেন। এতটা বোকা হবেন না।’

—মানে?

সে হেসে বললো, ‘আপনাকে বাবা দুলাভাইয়ের সাথে দেখা করতে বলেছে না? আমি সব জানি। দুলাভাই যে আমেরিকা চলে যাচ্ছেন আপুকে নিয়ে সেই খবর জানেন?’

বললাম, ‘না তো।’

শুনে সে আবারো হাসলো

—‘ভাইয়া, আপনাকে যে আমি বোকা বলেছি সেটা কী ভুল বলেছি বলেন? আপনি আসলেই বোকা। দুলাভাই আমেরিকা যাচ্ছেন এই খবর আপনি জানলে আপনি দুলাভাইয়ের সাথে দেখা করবেন না এটা বাবা জানেন। বাবা চান আপনি দুলাভাইয়ের হাতে চড় খান। ১০০তম চড় ! কারণ দুলাভাই আমেরিকা চলে গেলে আর চড় মারার সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে পারবেন না। আপনাকে চড় মেরে ১০০ পূর্ণ করে তারপর তিনি আমেরিকা যাবেন।’

শুনে আমি আতঙ্কিতবোধ করলাম। বললাম, ‘কিন্তু তোমার দুলাভাই আমাকেই চড় মারবেন কেন? আর তোমার বাবা-ই বা এমনটা করবেন কেন?’

মোনালিসা মুচকি হাসলো। তারপর আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো, ‘কারণ আপনি বাবাকে নিয়ে একটা ফান ম্যাগাজিনে উল্টাপাল্টা কথা লিখেছেন। বাবাকে ঘাস খাওয়া বোকাসোকা মানুষ বলেছেন। বাবা খুব রাগ করেছেন। কিন্তু সেটা মুখে বলেননি। দুলাভাইকে বলেছেন কথাটা। দুলাভাই বলেছেন আপনাকে চড় মেরে সেঞ্চুরি র্পূণ করে এরপরই তিনি আমেরিকা যাবেন। নিজেরও শখ পূর্ণ হবে, বাবারও ইচ্ছা র্পূণ হবে।’

আমি এক মূর্হূত ভাবলাম। তারপরই আমার মনে পড়ল মাসখানেক আগেই তো আমি বাবুল সাহেবকে নিয়ে ঠাট্টায় একটি রম্যগল্প লিখেছিলাম। যার শিরোনাম ছিল ‘সুগার অথবা ঘাসগল্প’। এত তাড়াতাড়ি সেটা ভুলে গেলাম কী করে? আশ্চর্য! আমাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মোনালিসা ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছেন? এক্ষুণি পালান, নয়তো বড় বিপদে পড়বেন। বাবা বলেছেন গরিব হয়ে বড়লোককে নিয়ে আজেবাজে কথা লেখার ভূত তিনি আপনার ঘাড় থেকে জম্মের মতো নামিয়ে দেবেন। কিছু একটা হয়ে যাওয়ার আগেই পালান।’

তার কথা শুনে আমার হুঁশ ফিরলো। আমি দৌড়ে পালালাম। মেইনগেট খোলাই ছিল। দৌড়ে বের হতেই দারোয়ান বললো, ‘আরে ভাই, এইভাবে দৌড়ায়া বাইর হইতাছেন ক্যান?’ আমি চারপাশ দেখে নিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ‘সেটা তুমি বুঝবে না ভাই। আমি গরিব মানুষ, বড়লোকের ক্যাঁচালের মধ্যে পড়ছি। না দৌড়ে উপায় আছে?’ সে কী বুঝলো জানি না। আমার কথা শুনে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাতে লাগলো। তাকে দ্বিধার মধ্যে রেখেই আমি রাস্তায় দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করলাম।

 

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, ঢাকা