রেজাউল হক কৌশিক
করোনায় দেশের অর্থনীতির সর্বোপরি বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে গেছে। এর আগে একযোগে অর্থনীতির ক্ষেত্রে এত বড় বিপর্যয় দেখেনি বিশ্ববাসী। এ বিপর্যয় থেকে উদ্ধারে গতানুগতিক দাওয়াই দিলে যে চলবে না সেটা বিভিন্ন দেশের সরকার ভালোই বুঝতে পেরেছে। আমাদের সরকারও এ বিষয়টা অনুধাবন করেই প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ভার পড়েছে ব্যাংকগুলোর কাঁধে। তবে সে ভার কতটা বহন করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় যেমন আছে তেমনি অনেক সম্ভাবনার দুয়ারও রয়েছে। ঐ দুয়ারগুলো খুলতে পারলেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের দৌড়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এজন্য ব্যাংকগুলোকে যথাযথভাবে এ কাজ করার জন্য সরকার থেকে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তদারকি করতে হবে। কাজটা কঠিন হলেও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এটা করার কোনো বিকল্প নেই।
করোনা পরিস্থিতিতে এখন যে অবস্থা হয়েছে তাতে শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। কলকারখানার চাকা ঘুরছে না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারঘোষিত প্রণোদনাগুলো ব্যাপক সহযোগিতা করতে পারে। তাতে শিল্পকারখানাগুলো অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবে। দেশের অর্থনীতি টিকে থাকবে। একইসঙ্গে আগামীদিনের মধ্যমআয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দিকে একধাপ এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ।
বলা হয়ে থাকে, দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে বেসরকারি খাত। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়ের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতনির্ভর। তাই সরকারকে বেসরকারি খাতের দিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। সরকারের প্রথম পদক্ষেপ দেখে মনে হয়েছে যে, সরকার এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব বিভিন্ন খাতের কথা উল্লেখ করে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এখন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, এসব প্যাকেজ বাস্তবায়নে নানা জটিলতা দেখা যাচ্ছে। সময়মতো গ্রাহকরা এসব প্যাকেজের ঋণ পাচ্ছেন না। ছোট-বড় সব শিল্পের মালিকই বলছেন যে, সময়মতো ঋণ না পেলে তো কারখানাই বন্ধ হয়ে যাবে। বন্ধের পরে ঋণ নিয়ে কিভাবে তা কাজে লাগাব? তারা বলছেন, শিল্প, ব্যবসাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই একথা ধ্রুব সত্য যে সময়ের কাজ সময়ে না করলে তার সুফল পাওয়া যায় না। এমনকি সে কাজের জন্য বিনিয়োগ করা সময় ও শ্রম সবই বৃথা যায়। তাদের কথায় যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। এসব প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আরো তত্পরতা দেখায় এবং সময়মতো গ্রাহকদের হাতে টিকে থাকার রসদ তুলে দেয় তাহলে তা বেসরকারি খাতের জন্য ভালো হবে। দেশের অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পাবে।
করোনা পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো যদি অন্য সময়ের মতো স্বাভাবিক আচরণ করে তাহলে হবে না। তবে ঋণ দেওয়া ও তা আদায়ের পুরো দায়িত্ব যেহেতু ব্যাংকের ওপর তাই তাদেরও সতর্ক থাকাটা দোষের কিছু নয়। করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেন প্রতারক ও ঋণখেলাপিরা ব্যাংক থেকে ঋণ বের করে না দেয় সেজন্য ব্যাংকগুলোকেও সতর্ক ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর একটা বিষয় ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, প্রভাবশালীরা প্রণোদনার ঋণ পেতে অনেকটা মরিয়া হয়ে গেছে। অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও তাদেরকে ব্যাংক থেকে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। অথচ তাদের কথা উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দও রাখা হয়েছে। কারণ শুধু বড়রা ঋণ পেলে অর্থনীতিতে সামঞ্জস্য থাকবে না। অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে উত্পাদক, ভোক্তা সবার কাছে টাকার প্রবাহ ঠিক থাকতে হবে। তা না হলে পণ্য উত্পাদন হবে কিন্তু কেনার লোক থাকবে না। তখন পুরো অর্থনীতিই ধসে পড়বে।
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ১৯টি প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। যার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই ৭৬ হাজার কোটি বা চার ভাগের তিনভাগ অর্থ বিতরণ করা হবে। প্যাকেজ ঘোষণার কয়েক মাস হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ঋণই দিতে পারেনি ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বলছে, ঋণের আবেদন যাচাই-বাছাই করতে বেশ সময় লেগে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই ঋণ দেওয়া হবে। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, আশ্বাস দিতে দিতে তো শিল্পই শেষ হয়ে যাবে। এখন টাকার প্রয়োজন। এখন না দিয়ে পরে দিলে তো কোনো কাজে লাগবে না। এখন বিশেষ সময়। আর বিশেষ সময়ে ব্যাংকগুলোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত ঋণ বিতরণ করা উচিত।