ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ আর নেই। তিনি শুক্রবার ভোরে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন )। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
তার ছেলে জিয়া হাসান ইবনে আহমদ জানান, রাত আড়াইটার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নেওয়া হয়। ভোর পৌনে ৬টায় আইসিইউতে তিনি মারা যান।
বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবকতুল্য এই শিক্ষাবিদ মৃদুভাষী ও সৌজন্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের পণ্ডিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অসংখ্য বইয়ের রচয়িতা তিনি। ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল, শিক্ষাঙ্গন, বুদ্ধিজীবী মহলসহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। তার স্ত্রী সেলিমা আহমদ ২০১৬ সালেই মারা গেছেন। অধ্যাপক দিলরুবা শওকতা আরা ইয়াসমিন ও অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন তাদের দুই মেয়ে। দুই ছেলের মধ্যে জিয়া হাসান ইবনে আহমদ সরকারি কর্মকর্তা, তানভীর ইকবাল ইবনে আহমদ একজন চিকিত্সক।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বিএনপিতে কোনো পদে না থাকলেও চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একজন পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। কবি আবদুল হাই শিকদারের সঙ্গে মিলে তিনি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত শত নাগরিক কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন এমাজউদ্দীন। ১৯৯২-৯৬ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) উপাচার্য ছিলেন।
তার কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিন্নাত আরা নাজনীন জানান, গতকাল বাদ জুমা কাঁটাবন ঢাল মসজিদে প্রথম দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আসরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে আরেক দফা জানাজা শেষে মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্ত্রীর পাশে দাফন করা হয়েছে এমাজউদ্দীন আহমদকে।
ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মৃত্যুর খবর শুনে রাজধানীর কাঁটাবন ঢালসংলগ্ন মরহুমের বাসায় ছুটে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতা অধ্যাপক সদরুল আমিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা মরহুমের শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। জানাজায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপি নেতৃবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এমাজউদ্দীনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ।
১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের অধিভুক্ত মালদাহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাশ করেন তিনি। স্নাতকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দুটি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছেন। এরই ফাঁকে ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রায় আড়াই দশক অধ্যাপনা করেছেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখির জন্যও এমাজউদ্দীন আহমদ খুব পরিচিত। ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে লিখেছেন ৫০টির বেশি বই। শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদকসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননা অর্জন করেন তিনি।
জাতীয় পার্টি-জেপির শোক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বলেন, তিনি আমাদের দেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ছিলেন। তারা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।