নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনাঢ্য প্রযুক্তিবিদ ফাহিম সালেহ (৩৩) হত্যার নেপথ্যে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে একাধিক বিষয়, বিশেষ করে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন এবং কারো সঙ্গে ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’ ছিল কি না সে বিষয়গুলো সামনে রেখে পুলিশের তদন্ত চলছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। তবে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। খুব শিগিগর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হবে বলে পুলিশ আশাবাদী।
এদিকে ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে, ফাহিম সালেহকে ইলেকট্রিক স্টানগান (টেজার) দিয়ে দুর্বল করে ঘাড় ও গলায় কাছে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কেটে তার দেহ টুকরো করা হয়। পরে হত্যার প্রমাণ মুছে ফেলতে প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে লাশ অন্য কোথাও ফেলে দেওয়া হতো এবং ফাহিমের এক কাজিন তার খোঁজে আসায় সে পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। কলবেলের শব্দ পেয়ে খুনি জরুরি বহির্গমণ সিঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে গেছে, এমনটাই মনে করছেন গোয়েন্দারা। গত বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টায় নিউ ইয়র্ক সিটির লোয়ার ইস্ট ম্যানহাটনের বিলাসবহুল কনডোমিনিয়াম (অ্যাপার্টমেন্ট) থেকে ফাহিমের টুকরো করা লাশ উদ্ধার করে নিউ ইয়র্ক পুলিশ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনাঢ্য এই তরুণ ২০১৫ সালে বাংলাদেশে চালু করেন জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’। গত বছর সোয়া মিলিয়ন ডলার দিয়ে বিলাসবহুল কনডোমিনিয়ামটি কিনেছিলেন তিনি।
একাধিক সূত্র জানায়, কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে পুলিশ তদন্ত করলেও প্রথম প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে ব্যাবসায়িক বিষয়কে। কারণ, নাইজেরিয়ায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘গোকাডা’ চালু করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছিলেন বাংলাদেশি আমেরিকান তরুণ ফাহিম সালেহ। পরে রাইড শেয়ারিং বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চালু করেন পার্সেল ডেলিভারি সার্ভিস। সেটি ব্যবসাসফল হয়। শুধু নাইজেরিয়ায় নয়, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় একই রকম দুটি সার্ভিস চালু করেন ফাহিম সালেহ। এছাড়া নিউ ইয়র্কে চালু করেন মূলধনী সংস্থা ‘অ্যাডভেঞ্চার ক্যাপিটাল’।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে নাইজেরিয়ায় ‘গোকাডা’ পরিচালনা নিয়ে কারো সঙ্গে ফাহিমের ব্যাবসায়িক বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বাংলাদেশে ‘পাঠাও’ চালুর পর ব্যবসাসফল হওয়ার পরও সেখান থেকে কেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন ফাহিম এ বিষয়টিও পুলিশের নজরের বাইরে নেই।
ব্যাবসায়িক বড় কোনো লেনদেনের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনে ফাহিম সালেহের সঙ্গে কারো দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল কি না সে বিষয়টিও তদন্ত করছে পুলিশ। এ ব্যাপারে পুলিশ তার পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেছে। ফাহিমের যে কজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব রয়েছে সেই তালিকায় কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে পরিবার তা বিশ্বাস করে না। পরিবারের মতে, ফাহিম খুবই কোমল হূদয়ের একজন মানুষ ছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিক ও মানবিক সম্পর্ক ছিল। কীভাবে ব্যবসা বড় করবেন সবসময় সেই চেষ্টাই করতেন। ফাহিম সালেহ সম্পর্কে পুলিশের কাছে এমন তথ্যই দিয়েছে তার পরিবার। তবে ফাহিম সালেহ যে পেশাদার খুনির হাতে নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছেন সে ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। পেশাদার খুনিকে কে বা কারা ভাড়া করেছিল, সেটিই এখন তদন্তের বিষয়।
পুলিশের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, খুনি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করে একটি গাড়িতে চড়ে ওই এলাকায় এসেছিলেন। পুলিশ সেই গাড়িটিরও সন্ধান পেয়েছে। সেই সূত্র ধরে সন্দেহভাজন খুনিকে তাদের কব্জায় নিয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দিতে নারাজ পুলিশ।
পুলিশ বলছে, ফাহিম সালেহ লিফটে সপ্তম তলা নির্বাচন করতে একটি ‘কি ফোব’ ব্যবহার করেছিলেন। ‘কি ফোব’ সাধারণত ভবনের বাসিন্দা এবং অনুমোদিত ব্যক্তির লিফট ব্যবহারের জন্য। তবে পুলিশ যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে সেখানে একজন ব্যক্তি কালো পোশাক পরা এবং একটি ব্যাগ হাতে ফাহিম সালেহের সঙ্গেই লিফটে প্রবেশ করে। কিন্তু ওই ব্যক্তি ‘কি ফোব’ ছাড়াই অন্য একটি মেঝে নির্বাচন করেছে এমন অভিনয় করে। এসময় দুজনের মধ্যে বাক্য বিনিময়ও হয়। ভিডিও ফুটেজে শব্দ ধারণ না থাকায় তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে তা পুলিশের পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। ফাহিম সপ্তম তলায় তার বাসার ফ্লোরে নেমে গেলে কালো পোশাক পরা লোকটিও নেমে যায় এবং ফাহিমকে লক্ষ্য করে ইলেকট্রিক স্টানগান বা টিজার জাতীয় কিছু ছুড়ে মারে। পরের কোনো দৃশ্যের বর্ণনা দেয়নি পুলিশ।