প্রতি রাতের মতোই পরম নিশ্চিন্তে মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতে গিয়েছিল শিশু সাদিয়া। কিন্তু সেই ঘুম আর ভাঙল না তার। বাবা-মা ও একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকেও গলা কেটে হত্যা করেছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা শহরের মাস্টারপাড়া মহল্লায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময়।
নিহতরা হলেন উসমান গণি (৪০), তার স্ত্রী কাজিরন বেগম (৩৫), পুত্র তাজুল (১৭) এবং শিশু কন্যা সাদিয়া (৭)। খবর পেয়ে গতকাল শুক্রবার সকাল দশটায় মধুপুর থানা পুলিশ ঐ বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। লাশ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের চারজন খুনের ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত উসমানের শ্যালক এবং কলেজছাত্র আল আমীন জানান, হতভাগ্য উসমানের বাড়ি মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী গ্রামে। দীর্ঘ দিন ধরে রিকসা-ভ্যান কেনাবেচার ব্যবসা করতেন তিনি। মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই সহজ-সরল। বছর খানেক আগে মধুপুর পৌরশহরে মাস্টারপাড়ায় শ্বশুর আবু তাহেরের বাড়ির কাছেই কিছু জায়গা কিনে টিনশেড বাড়ি করেন। সেখানেই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তার এক ছেলে দুই মেয়ে। বড়ো মেয়ে সোনিয়ার তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছে। পুত্র তাজুল ভাইঘাট কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে এবং কন্যা সাদিয়া স্থানীয় মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তো। পড়শী হাবলু মিয়া জানান, দুই দিন ধরে বাসাটি তালাবদ্ধ ছিল। গ্রামের বাড়ি গেছেন ভেবে পড়শিরা কেউ মাথা ঘামায়নি।
নিহতের বড় কন্যা সোনিয়া এক সঙ্গে পরিবারের সবার জবাই করা লাশ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরলেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। কান্নার ফাঁকে আল্লাহর কাছে খুনিদের বিচার দাবি করেন। তার কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, সাদিয়াকে মা খুব আদর করতেন। তার সঙ্গেই রাতে বিছানায় ঘুমাতেন। দুদিন ধরে শ্বশুড়বাড়ি থেকে একাধিকবার ফোন দিয়ে কাউকেই তিনি পাচ্ছিলেন না। চিন্তিত হয়ে শুক্রবার সকালে তার এক নানীকে বাসায় খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠান। তিনি গিয়ে দেখেন বাসা তালাবদ্ধ। কিন্তু পচা গন্ধ আসছে। পরে এক পাশের আধা খোলা জানালায় উঁকি দিয়ে দেখেন ভিতরে খাটের ওপর উসমান গনির লাশ। পরে ফোন দিলে মধুপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হয়। সঙ্গে সংবাদকর্মীরাও ছিলেন।
বাসায় মোট চারটি রুম। উসমান গনির গলাকাটা লাশ বিছানায় পড়ে ছিল। রক্তে ভাসা চাদর ও তোষক। পাশের রুমে একই খাটে মা ও মেয়ের গলা কাটা লাশ। মায়ের লাশ উপুড় হওয়া থাকলেও বামপাশে চিত্ হওয়া মেয়ের লাশের ওপর তার হাত রাখা ছিল। সম্ভবত মারা যাওয়ার আগে পরম মমতায় মেয়ের অস্তিত্ব জানার চেষ্টা করছিলেন মা। অপর কক্ষে খাটের নিচে ছিল তাজুলের লাশ। রুমে হাতুড়ি ও কুড়াল ছিল। জবাই করার আগে শক্ত কিছু দিয়ে তাদের আঘাত করা হয় বলে পুলিশ জানায়।
মধুপুর থানার ওসি তারিক কামাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সবাইকে ধারালো অস্ত্রে জবাই করা হয়। খুনের কারণ এখনি বলা যাচ্ছে না। পুলিশ তদন্ত করেছে। কয়েকটি বিষয় নিয়ে সামনে আগাচ্ছি। খুব তাড়াতাড়ি খুনি ধরা পড়বে এবং রহস্য উদ্ঘাটন হবে।
জেলা পিবিআই ও সিআইডি পুলিশের ক্রাইম সিন বিভাগ ঘটনাস্থলের ছবি, নমুনা ও আনুষঙ্গিক আলামত সংগ্রহ করেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় ।