বাংলাদেশে ঔষধশিল্পের বিস্ময়কর উত্থান হইয়াছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এই দেশে ব্যবহূত ঔষধের সিংগভাগই বিদেশ হইতে আমদানি করা হইত। এখন ঔষধ উত্পাদনে আমরা শুধু স্বাবলম্বী নহি, পৃথিবীর ১৬০টিরও বেশি দেশে আমরা তাহা রপ্তানিও করিয়া থাকি। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ঔষধশিল্প সম্ভাবনার নয়া দিগন্ত উন্মোচন করিয়াছে। এমনকি ঔষধ রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অনুন্নত ৪৮ দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দেশ। কিন্তু যখন শুনি ঔষধের দাম নিয়া কারসাজি চলিতেছে, চলিতেছে ভেজাল ঔষধের ছড়াছড়ি, তখন আমরা আশাহত না হইয়া পারি না। এই সকল ন্যক্কারজনক কাজ যাহারা করিতেছেন, তাহারা বিভিন্ন ভুঁইফোঁড় ও ছোট ছোট কোম্পানির অধিকারী। বৃহত্ কোম্পানি লইয়া তেমন কোনো অভিযোগ নাই। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোম্পানিগুলির যন্ত্রণায় মানুষ অস্থির। ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়িতেও আজকাল তৈরি হইতেছে ভেজাল ও নকল ঔষধ। ইহার পর অভিজাত ফার্মেসিগুলিতে তাহা বিক্রয় করা হইতেছে। শুধু ঔষধ নহে, নকল প্রসাধনী তৈরিও হইতেছে একই পথ ধরিয়া। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক দিন ধরিয়াই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশ হইতে ভিটামিন, মালটি ভিটামিন, চুল ও চোখের সিরাপ, ক্যাপসুল ও বিভিন্ন ধরনের লোশন আমদানি বন্ধ রহিয়াছে। ইহারই সুযোগ নিতেছে প্রতারক চক্র। তাহারা এই সব ঔষধ ও প্রসাধনসামগ্রী নকল করিয়া বাজারজাত করিয়া আসিতেছে। এর জন্য ব্যবহার করিতেছে নানা ধরনের হলোগ্রাম, ট্রেডমার্ক এমনকি বিএসটিআইয়ের নকল লোগোও। এক পরিসংখ্যানমতে, দেশীয় বাজারে ভেজাল ও নকল ঔষধের বার্ষিক বিক্রয় প্রায় ১ দশমিক ৫ হাজার কোটি টাকা। ইহার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রাণহানির ঘটনাও বাড়িতেছে। ক্যানসারসহ নানা রোগ তৈরির কারণ হইয়াও পড়িতেছে। সুপরিচিত বা অখ্যাত অনেক কোম্পানির ঔষধেই বাজার সয়লাব হইতে দেখা যাইতেছে। জরুরি প্রয়োজনে জীবন রক্ষাকারী ঔষধ নকল হইতেছে বেশি। জীবন রক্ষাকারী প্রাথমিক স্তরের প্যারাসিটামল, ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক, অ্যান্টিবায়োটিক এজিথ্রেমাইসিন, ফ্লুক্লোসাসিনসহ সব গ্রুপের ঔষধই নকল ও ভেজাল হইতেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ২৫৭টি কোম্পানির কারখানায় বত্সরে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ঔষধ উত্পাদিত হইতেছে। বত্সরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঔষধ ও কাঁচামাল উত্পাদিত হয় এই সব কারখানায়। দেশীয় ৪৬টি কোম্পানির প্রায় ৩০০ প্রকারের ঔষধপণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়। তাই সাধারণ মানুষকে রক্ষা ও বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি বাড়াইতে ভেজাল ও নকল ঔষধ উত্পাদনের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা উচিত। আসলে নকল-ভেজাল ও মানহীন ঔষধ উত্পাদনের মূলে রহিয়াছে মিটফোর্ডে খোলাবাজারে বিক্রয় হওয়া কাঁচামাল। অথচ আইন অনুযায়ী ঔষধ তৈরির কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ নাই। এই আইনের বরখেলাপ কাম্য নহে। দেশীয় বাজারে উত্পাদিত ভেজাল ও নকল ঔষধের কারণে ক্রমেই অস্থির হইয়া উঠিতেছে আমাদের ঔষধশিল্প ও চিকিত্সাব্যবস্থা। অতএব, নকল ঔষধ ও প্রসাধনীর বাজারজাত ঠেকাইতে ঔষধ প্রশাসনের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। কথায় বলে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। তাই সুস্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের নিজেদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াইতে হইবে। ভেজাল ও নকল ঔষধ এবং প্রসাধনী পরিহার করিতে হইবে।