কোরবানির হাটে একদিন

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

সকাল-সকাল উঠেই বাপবেটা হাটে ছুটলাম। মোবাইলে বেশ কিছু অফার, অফার আছে ফেসবুকেও। সঙ্গে আইসিটি মন্ত্রণালয় আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কোরবানির হাট তো আছেই। কোরবানির হাটে ঘোরাঘুরিটা এবার বেশ হবে। সূর্যকে নতুন একটা ল্যাপটপ কিনে দেওয়া হয়েছে। করোনাকালে স্কুলের ক্লাস এখন অনলাইনে। ক্লাস এইটে সূর্যর কপালে এই ছুতায় জুটে গেছে সার্বভৌম একটা ল্যাপটপ। আর তাতে চেপেই বাপবেটার কোরবানির হাট যাত্রা। এসি রুমে বসে এই হাট থেকে সেই হাটে ছোটাছুটি করতে অদ্ভুতই লাগছে। এই গত বছরও ৩০০ ফুটের গরুর হাটে যেয়ে হাঁটুসমান গোবরে পা ডেবে কি বিতিকিচ্ছিরি এক অবস্থা! এক পায়ের স্যান্ডেল সামলাই তো অন্য পায়ের স্যান্ডেল গোবরের গহীন তলদেশে। এর মধ্যেই পুরো হাট ঘোরা। কাজ হলো না। গরু পছন্দ হলে দামে হয় না, আর দাম কাছাকাছি গেলে গরুতে বনে না। রঙ খারাপ তো পিছা ছোট। শিংটা আরো বড় হলে মন্দ হতো না। দাঁত একটা বেশি তো কুঁজের ওপর কাটা দাগ। কি আর করা? ঝামেলা একটা না একটা থেকেই যাচ্ছে। অগত্যা গাড়িতে উঠে ড্রাইভারের স্যান্ডেল রিকুইজিশন করে ছুটলাম ১০০ ফিটের গরুর হাটে। এটুকু পথ পাড়ি দিতে মোটামুটি দেড়টা ঘণ্টা। ১০০ ফুটে আরো ঘণ্টা তিনেক ঘোরাঘুরি। তারপর কপালে গরুর শিকে ছিঁড়ল। আমি আর সূর্য অবশেষে ‘গরু জয়ের যুদ্ধে জিতে’ বীরদর্পে বাসায় ফিরে, গোসল সেরে, চায়ের পেয়ালাটা নিয়ে বসতে বসতে সন্ধ্যা।

আজ অবশ্য গরু কিনতে সময় লাগল সামান্যই। কেজি হিসেবে পছন্দের গরুটিকে কিনতে বড় জোর আধা ঘণ্টা কি এক ঘণ্টা। বিকাশে অর্ধেক দাম পাঠিয়ে বুকিংটাও কনফার্ম করে ফেললাম। ঈদের আগের দিন ডেলিভারি হবে। তারপর বাকি টাকা দেওয়ার পালা। গরু কেনাকাটা শেষ করে বাপবেটা নেটফ্লিক্সে ছবি বাছাই করছি আর ভাবছি ধন্য এই ডিজিটাল বাংলাদেশ! এই ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণেই ডিজিটালভাবে হাটে-হাটে হবে এবারের কোরবানির ঈদে গরুর কেনাবেচা, আর বেঁচে যাবে কতগুলো অমূল্য জীবন। আগামী কোরবানির ঈদের পর দেশে যদি কোভিডের দ্বিতীয় পিকটা দেখা দেয়, তাতে অনেকের মতো অবাক হব না আমিও।

গত রোজার ঈদের আগে-পরে কোটি কোটি মানুষের যে দেশব্যাপী ছোটাছুটি, তার কল্যাণে কোভিডটা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুর আর বড়জোর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রোগ থেকে পরিণত হয়েছিল জাতীয় রোগে। তখন দেশে গড়ে হাজারখানেক মানুষের কোভিড রোগ ধরা পড়ছিল প্রতিদিন, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজারের বেশিতে। তখন মারা যেত দিনে ১০ জনের মতো মানুষ, আর এখন মারা যাচ্ছেন ৩০ থেকে ৪০ জন। আগামী কোরবানির ঈদ উদ্যাপনে আমরা যদি একটু সংযত না হই, তাতে এই ৩ হাজার বেড়ে যদি ৬ হাজার হয়, আর প্রতিদিন যদি আমরা গড়ে আরো  ৬০-৭০ জন করে মানুষ হারাই, সেটাও কিন্তু খুব অবাক করা কিছু হবে না। এই যে ডিজিটাল গরুর হাট আর সঙ্গে তিন দিনের কোরবানির ঈদের সরকারি ছুটি, এই দুইয়ের কল্যাণে আশা করি আমরা একটা বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়ে যাব। হয়তো কোরবানির পর সত্যি-সত্যি ফ্ল্যাট হতে শুরু করবে কোভিডের ঘাড় ত্যাড়া কার্ভটি বাংলাদেশেও। শুধু কি তাই, কোরবানির হাটকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরের এই যে এত শত যানজট, পরিবেশ দূষণ আর আবর্জনার পাহাড়, এসব কিছুই এবার হয়তো আর থাকবে না। নগরবাসীর কোভিড রোগের বোঝার ওপর শাকের আঁটিটি কোরবানির ঈদ শেষে এবার বোধ হয় আর দেখার দরকার পড়বে না।

বরাবর চাঁদাবাজরা গরুর ট্রাকগুলোর চাঁদা তুলে মেটাত তাদের ইয়াবার খরচ। ইয়াবার  ব্যবসাতো এবার একেবারেই মাঠে মারা! একেতো কোভিডের কারণে সীমান্তে কড়াকড়ি, ইয়াবার চালানে ঘাটতি, তার ওপর যদি চাঁদাবাজিতে এমন ধস নামে, ইয়াবা ব্যবসার ধস নামতে আর বাকি কোথায়? ইয়াবা ব্যবসায় এমন দুর্দিন বাংলাদেশে আর এসেছে বলে মনে হয় না।

মাথায় বাড়ি মলম পার্টি আর ছিনতাইকারীদেরও। প্রতিবারই অনেক খামারি আর গরু বিক্রেতা ঘর ফিরতি পথে তাদের শিকারের সর্বস্বান্ত হয়েছেন, এমন খবর পত্রিকা আর টিভিতে দেখা যেত ঈদের পর। এখনতো খামারিরা খামারে খামারে আর গৃহস্থরা ঘরে বসেই পশুর হাটে পশু বিক্রি করছেন।

এবারে আমাদের ঈদ যেমন বাসায়, তেমনি খামারি আর গৃহস্থের ঈদও এবার বাসাতেই। এবার খামারির ছেলেকে আর গৃহস্থের পরিবারকে অধীর আগ্রহে বসে থাকতে হবে না গরু বিক্রি করে তাদের পরিবারের প্রিয়জনটি ঈদের দুদিন পরে কখন ঘরে ফিরবেন এই আশায়। আর সবচেয়ে বড় কথা গরু কেনাকাটায় এই যে ডিজিটাল গরুর হাট, ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়েও আমরা নিশ্চয়ই ডিজিটাল হব। এই কোরবানির ঈদে প্রিয়জনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়টা করে নিব জুমে, কারণ তাতে বেঁচে যাবে আরো ৮০ জন চিকিত্সকের প্রাণ। প্রাণে বাঁচবেন আরো ৪৫ জন পুলিশ কর্মী। আরো কয়েক হাজার পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর শোকে মুহ্যমান হতে হবে না ঈদের পর। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের নিজেদের কারণে আমরা হারাব না আমাদের কোনো স্বজনকে। ধন্য ডিজিটাল বাংলাদেশ, ধন্যবাদ সবাইকে।

n লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ