করোনায় কৃষি ঋণের লক্ষ্যে হোঁচট

২০১৯-২০ অর্থবছর

কমেছে আদায়ের পরিমাণও

রেজাউল হক কৌশিক

করোনার কারণে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সদ্য সমাপ্ত (২০১৯-২০) অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণের লক্ষ্য ছিল ২৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। তবে বছর শেষে এ খাতের ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। অর্থাত্ লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ কম ঋণ বিতরণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, করোনার কারণে লকডাউন ঘোষণার পর বন্ধ হয়ে যায় ব্যাংকের অনেক শাখা। আর যেসব ব্যাংকের শাখা খোলা ছিল সেগুলোতেও কাজ সীমিত ছিল। ফলে কৃষকরা ব্যাংকের শাখায় আসতে পারেনি। অন্যদিকে ব্যাংকাররাও কৃষকসহ অন্য ঋণ ছাড় করেনি। এতে কৃষি ঋণ বিতরণ হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার পরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য সরকার ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। সাধারণ ঋণের পাশাপাশি প্রণোদনার ঋণকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কৃষিকে চাঙ্গা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার বিস্তার রোধে সাধারণ ছুটিতে দেশের প্রায় সব খাতই স্থবির হয়ে পড়ে। তবে পুরোটা সময় সচল ছিল কৃষি খাত। সরকারের পক্ষ থেকে সংকটের সময় কৃষি খাতকে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। কৃষিতে উত্পাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। কৃষি খাতে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধির জন্য আগামী ১ বছর সুদভর্তুকি দেবে সরকার। কৃষকরা ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। আর ৫ শতাংশ সুদভর্তুকি হিসেবে ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করবে সরকার। এছাড়া কৃষি খাতের ঋণের অন্তত ৬০ শতাংশ শস্য খাতে দিতে হবে। কিন্তু সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী কৃষকদের সেবা দিতে এগিয়ে আসেনি ব্যাংকগুলো। সীমিত আকারে ব্যাংক খোলা ছিল শুধু শহরাঞ্চলে। উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের সব শাখা বন্ধ ছিল। নতুন ফসল আবাদে ঋণের জন্য আবেদনই করতে পারেননি কৃষক। ফলে মহামারির সময় চাহিদা অনুযায়ী ঋণও পায়নি তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চে কৃষি খাতে ৩ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো, যা আগের বছরের মার্চের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। গত বছরের এই মাসে ৬ হাজার ২২২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। পরের মাস এপ্রিলে কৃষিঋণ বিতরণে ধস নামে। এপ্রিলে মাত্র ৪৯৬ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো। আগের বছর একই সময় ঋণ দেয় ২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এপ্রিলে ঋণ বিতরণ কমে প্রায় ৭৯ শতাংশ। এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে ঋণ বিতরণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। তবে তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণ বিতরণ কমেছে ৩৭ শতাংশ। আগের বছরে মে মাসে ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে ১ হাজার ৮১০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে। তবে গেল মাস জুনে আগের তিন মাসের তুলনায় কৃষিঋণ বেড়েছে। জুন মাসে ৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকগুলো। জুনে কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়লেও লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি ব্যাংকগুলো। গেল অর্থবছরে লক্ষ্যের চেয়ে ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ ঋণ বিতরণ কম হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গেল অর্থবছরে কৃষিঋণের আদায়ও অনেক কমে গেছে। জুন শেষে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৩ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। সেই হিসেবে আদায় কমেছে ২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। অর্থবছরের জুন শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ২ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ পল্লি অঞ্চলে বিতরণ করতে হয়। পল্লি অঞ্চলে অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা ও খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টিতে সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক এ নির্দেশনা জারি করে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে অনর্জিত লক্ষ্যমাত্রার সমপরিমাণ অথবা বিকল্পভাবে অনর্জিত লক্ষ্যমাত্রার ৩ শতাংশ হারে হিসাবায়নকৃত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।