দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মধ্যাঞ্চলে স্থিতিশীল রয়েছে। পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, আত্রাই, করতোয়া, ধরলাসহ আরো কয়েকটি নদনদীর পানি এখনো বিভিন্ন পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। এতে গত ২৪ ঘণ্টায় শেরপুর, নওগাঁ, ফরিদপুর, রাজশাহী ও পাবনায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বন্যায় শেরপুর-জামালপুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জেলার ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ১০ হাজার মানুষ। নওগাঁয় ৪০ গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুসহ তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দি হয়ে কয়েক লাখ বানভাসি মানুষ এখন সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার্ত মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে গবাদি পশু ও গৃহস্থালি সামগ্রী নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশে ১০১টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে ৪১টিতেই শনিবার নদনদীর পানি বেড়েছে। এর মধ্যে ২২টি পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। আর ৫৯টি পয়েন্টে পানি কমতে শুরু করেছে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, নাটোর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলায় ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিতে তলিয়ে থাকায় চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২ লক্ষাধিক বানভাসি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ত্রাণ স্বল্পতার কারণে চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংকটে পড়েছে বন্যাদুর্গতরা। চারণভূমি তলিয়ে থাকায় তীব্র হচ্ছে গবাদি পশুর খাদ্যের সংকট। চরাঞ্চলের বন্যাকবলিত এলাকায় নৌকা ভিড়লেই ছুটে আসছে নারী-পুরুষ। অপ্রতুল ত্রাণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। কারো ভাগ্যে জুটছে কারো জুটছে না।
শনিবার দুপুরে বন্যার পানিতে ডুবে উলিপুর উপজেলায় দুই শিশু ও চিলমারী উপজেলায় এক গ্রাম পুলিশের মৃত্যু হয়েছে। এরা হলো উলিপুরে চর বাগুয়া গ্রামের মোন্তাজুল ইসলামের শিশুপুত্র বায়েজিদ ইসলাম (৮), হাতিয়া ইউনিয়নের চিড়াখাওয়ার পাড় এলাকার শিশু মুন্নি খাতুন এবং চিলমারী উপজেলার থানার হাট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সুরুজ্জামান মিয়া (৫৫)। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, গত ২০ জুন থেকে এ পর্যন্ত কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জনই শিশু।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে আকস্মিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর-জামালপুর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরাতন ভাঙা অংশগুলো দিয়ে দ্রুত বন্যার পানি প্রবেশ করায় সদর ও নকলা উপজেলার ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বীজতলা, সবজির আবাদ ও খেতের ফসল।
ন?ওগাঁ প্রতিনিধি জানান, জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কয়েকটি জায়গা ভেঙে রানীনগর, আত্রাই ও মান্দা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে ৪ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ৪০ গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। চারটি স্থানে সড়ক ভেঙে গিয়ে মান্দা-আত্রাই আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে কয়েক শ পুকুরের কয়েক কোটি টাকার মাছ। বন্যাকবলিত পরিবারের লোকজন আসবাবপত্র নিয়ে বাঁধ ও উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে গতকাল বিপত্সীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। প্রবল সে াত ও ঢেউ এড়িয়ে চলতে গিয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ফেরি-লঞ্চ চলাচলে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। উভয় ঘাটে সহস াধিক পণ্যবাহী ট্রাকসহ বহু যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। এছাড়া আরিচা-জাফরগঞ্জ বেড়িবাঁধের বেশ কয়েক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অনেকেই পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি গতকালও বিপত্সীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নদী তীরবর্তী জেলার চার উপজেলার ২৬ ইউনিয়নের দেড় লাখ পানিবন্দি মানুষ শুকনো খাবার, গবাদি পশুর খাদ্য সংকট, জ্বালানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
সুজানগর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার সাগরকান্দী ইউনিয়নে প্রায় ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ফসলি জমি। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে পাঁচ-ছয়টি কাঁচা-পাকা সড়ক।
বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাড়িঘর, পুকুরের মাছ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাঁধের করুণ অবস্থা। যে কোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে আরো কয়েকটি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যেতে পারে।
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, পদ্মা নদীতে পানি বাড়ায় উপজেলার আকোটেরচর ও ঢেউখালী ইউনিয়নে নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া চরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এলাকার নলকূপ ডুবে যাওয়ার কারণে বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য গরু-ছাগল নিয়ে স্কুল, উঁচু রাস্তা ও বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
নবনির্মিত সাইক্লোন সেন্টার নদীতে!
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার মেঘনা নদীর পশ্চিমপাড় রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নে আবারও পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এলাকার নবনির্মিত তিনতলা ওমর আলী স্কুল কাম সাইক্লোন সেন্টারটি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মাত্র এক মাস আগে দৃষ্টিনন্দন ভবনটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এছাড়া গত কয়েক দিনের ভাঙনে এলাকার প্রায় ২ শতাধিক বসতবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে আরো প্রায় ৫ শতাধিক বাড়িঘর ভাঙনের মুখে পড়েছে।