আধুনিকায়নের নামে চলছে পাটশিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা

ইত্তেফাক রিপোর্ট

আধুনিকায়নের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বাম নেতারা।  গতকাল শনিবার বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের আধুনিকায়ন, না ধ্বংস সাধন? পাটখাত সুরক্ষায় ভাবনা ও করণীয় শীর্ষক’ ওয়েবিনারে তারা একথা বলেন।

বক্তারা বলেন, পাটকলগুলো রাষ্ট্রের হাত থেকে সরিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাদের অভিযোগ, বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কারের নামে বেসরকারিকরণ ও গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের যে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। পাটশিল্প বন্ধ করার মধ্য দিয়ে সমস্ত পাট খাতই ধ্বংস হবে।

ওয়েবিনারে সভাপতির বক্তব্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, কেবল কতিপয় আমলা-ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করে নয়; পাট সংশ্লিষ্ট সকল অংশিদারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে সংলাপ আয়োজনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

ওয়েবিনারে প্যানেল আলোচক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক, আত্মঘাতী ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকারক। বিশ্ব পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে পাটখাতের সম্ভাবনা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও চাহিদা বাড়বে। ‘পিপিপি’র পরীক্ষা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যমান পাটকলগুলোর উন্নয়ন সাধনের আহ্বান জানান তিনি।

ঐক্য ন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টচার্য্য বলেন, লোকশানের কথা বলা বজ্রপাত তুল্য। সত্যটা হলো দুর্নীতি, যার কারণ লোকশান। পাটকল ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অযোগ্যতা পর্যালোচনা হওয়া উচিত। তিনি সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগের আহ্বান জানান। ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। এটা পিপিপি নয়, এটা প্রাইভাইটাইজেশন। সরকারের এই সিদ্ধান্তে পাটের বাজারে ধস নামবে, পাটচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

পাট কমিশনের সাবেক সদস্য খালেদ রব বলেন, পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। যদিও সরকার তার জোটসঙ্গীদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করেছে বলে মনে হয় না। অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, পাট কোনো ‘অস্তগামী শিল্প’ নয়। বিশ্বব্যাংককে সন্তুষ্ট করার জন্য এই সিদ্ধান্ত।

পাটকল শ্রমিক নেতা শহিদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, পাটশিল্প আধুনিকীকরণে ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি লিখিত প্রস্তাব আমরা সরকার প্রধানের নিকট দিয়েছিলাম। তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাই তারা করলেন না। জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কামরুল আহসান বলেন, পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গীকারের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা। শ্রমিক কর্মচারি ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়া আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এটা লুটপাটের অর্থনীতির ফল।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের নেতা আমানুর রহমান বলেন, পাটখাত দিয়েই এদেশে অর্থনীতির বিকাশ হয়েছিল। পাটখাতে অবশ্যই সাবসিডি দিতে হবে। মোস্তফা মনোয়ার বলেন, যারা ব্যালেন্সসিট দেখে অর্থনীতির ব্যাখ্যা করেন তারা অর্থনীতিবিদ নন, তারা অ্যাকাউন্টেসির লোক। আমাদের কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে হবে। আলোচনায় আরো অংশ নেন যশোর জুটমিলের সিবিএ-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন রশিদ মল্লিক, হাফিজ জুট মিলের সিবিএ-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম, খুলনার প্লাটিনাম জুটমিলের সিবিএ-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান।

আলোচনার শেষে ওয়েবিনারের মূলপত্র উপস্থাপক ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিপূর্ণ রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক নয়। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে পাটই ছিল আমাদের রাজনৈতিক দাবির কেন্দ্রবিন্দু। সংবিধানে মালিকানার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের যে প্রাধান্য রয়েছে এই সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে তাও নাকচ হয়ে গেল।

বঙ্গভবন-গণভবন মানববন্ধন করবে সিপিবি

পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল এবং পাট ও পাটশিল্প রক্ষায় আগামীকাল সোমবার বেলা ১১টায় বঙ্গভবন থেকে গণভবন পর্যন্ত মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। গতকাল শনিবার সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম এক যুক্ত বিবৃতিতে এ কথা জানান।