ছিল না অনুমোদন দিত ভুয়া সনদ

করোনার ভুয়া রিপোর্ট তৈরি, অনুমতি ছাড়াই করোনা ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বেসরকারি সাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আবুল হাসনাতসহ তিন জনকে আটক করেছে র্যাব। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশানের সাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায়। প্রতারণার প্রমাণ মেলায় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আবুল হাসনাত ও হাসপাতালের ইনভেন্টরি অফিসার শাহরিজ কবির সাদিসহ তিন জনকে আটক করা হয়। র্যাবের এ অভিযানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

র্যাব সূত্র জানায়, সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সাহাবউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার অনুমোদন বাতিল করলেও অবৈধভাবে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা চলছিলো। এই পরীক্ষার নামে রোগীদের কাছ থেকে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছিল। এমনি তারা করোনা টেস্ট না করেই ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। অভিযানে হাসপাতাল থেকে ভুয়া রিপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে। এসব রিপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে কম্পিউটার স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে করে বসিয়ে নিতো বলেও জানিয়েছে র্যাব।

র্যাব জানায়, গুলশান ২ নম্বরের ১১৩/এ নম্বর সড়কের সাহাবউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে র্যাবের অভিযান শুরু হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চলাকালে করোনা পরীক্ষায় ও চিকিত্সায় ব্যবহূত সরঞ্জাম, উপকরণ, রিপোর্ট ও নথিপত্র যাচাই করা হয়। বিকাল পাঁচটার দিকে এসব যাচাই-বাছাই কাজে অভিযান পরিচালনাকারী দলকে অসহযোগিতা করায় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল হাসনাতকে আটক করে র্যাব। এর আগে অভিযানের শুরুতেই আটক করা হয় হাসপাতালের ইনভেন্টরি অফিসার শাহজির কবির সাদিকে। র্যাব হাসপাতালটিতে তল্লাশি চালিয়ে বেশ কিছু করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার কিট, করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট, অনুমোদনহীন ও বিক্রয়-নিষিদ্ধ ওষুধ জব্দ করে র্যাব। এছাড়া অপারেশন থিয়েটারে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে ১১ বছর আগের সার্জিক্যাল সামগ্রী জব্দ করা হয় বলে অভিযানে অংশ নেয়া এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

আদালত পরিচালনাকারী র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, সাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি ঘোষণা দিয়েছিল যে, তাদের আরটিপিসিআর মেশিন রয়েছে এবং সেই মেশিনেই তারা করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করে। তবে র্যাব হাসপাতালটিকে এ রকম কোনও মেশিন দেখতে পায়নি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অ্যান্টিবডি পরীক্ষার কোনো অনুমোদন না থাকলেও তারা কিট দিয়ে বিভিন্ন মানুষের করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করেছে। এমনকি অ্যান্টিবডি পরীক্ষার নামে তারা রোগীদের কাছ থেকে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ পেয়েছি।

ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, হাসপাতালের পাঁচটি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। আমরা একটিতে তল্লাশি চালিয়ে পাঁচটি মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল টিউব পেয়েছি। এগুলোর একটির ২০০৯ সালে, দুটির ২০১১ সালে এবং একটির গত এপ্রিল মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। এসব টিউব সাধারণত অপারেশনে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার সময় রোগীর শ্বাসনালীতে ঢোকানো হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল টিউব ব্যবহারে রোগীর ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। এতে অনেক সময় রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আমরা তিনটি অভিযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের কোভিড-১৯ পরীক্ষার অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু তাদের কোভিড-১৯ পরীক্ষার স্বয়ংক্রিয় মেশিন না থাকায় এই অনুমোদন বাতিল করা হয়। এরপরও তারা গোপনে কোভিড-১৯ পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিল। তারা বাইরের রোগীদেরও টেস্ট করেছে। এই টেস্টগুলো তারা ডিভাইসের মাধ্যমে করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ডিভাইস ব্যবহারের অনুমোদন নাই। আর যেসব রিপোর্ট দিয়েছে তা সবই ভুয়া। দ্বিতীয় অভিযোগ হলো- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু পরীক্ষা বাইরের অন্যান্য হাসপাতাল থেকে করে তা নিজেদের হাসপাতালের প্যাডে লিখে রোগীদের দিয়েছে। তৃতীয় অভিযোগ হলো- তারা কিছু প্রোডাক্ট যেমন মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি তারা একাধিকবার ব্যবহার করছে। এগুলো মূলত একবার ব্যবহার উপযোগী। কিন্তু তারা এগুলো বার বার ব্যবহার করছে। 

 

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ বলেন, এই হাসপাতালে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কোনো অনুমোদন নেই। পরীক্ষা না করেই প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগও আমরা পেয়েছি। সে কারণেই এখানে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে গিয়ে হাসপাতালটি থেকে করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি টেস্টের রিপোর্ট যে পাওয়া গেছে, তা বাংলাদেশে অনুমোদিত নয়। এছাড়াও সেখানে আরটিপিসিআর মেশিন পাওয়া যায়নি, পরীক্ষা ছাড়া ভুয়া রিপোর্ট তৈরি, করোনা নেগেটিভ রোগীকে পজিটিভ দেখিয়ে হাসপাতালে ভর্তির অনিয়ম পাওয়া গেছে। আমরা হাসপাতালের অনিয়িমগুলো খতিয়ে দেখছি। অভিযানে এ পর্যন্ত হাসপাতালের তিনজনকে আটক করা হয়েছে।