একটি বলপেনের দাম বাজারে ৮ থেকে ১০ টাকা। প্রতিটির বিল করা হয়েছে ৮০ টাকা। ২০ টাকার প্রতিটি রাইটিং প্যাডের বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৮০ টাকা। প্রতিটি ব্যাগের দাম গায়ে লেখা আছে ৩৭০ টাকা। কিন্তু প্রতিটির জন্য অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে ১ হাজার ৫০ টাকা। এমনটি ঘটেছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য শিক্ষা ও উদ্বুদ্ধকরণ বা আইইএম বিভাগে। শুধু তাই নয়, কিশোর-কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৪৮৬টি কর্মশালা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় আইইএম বিভাগকে। ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল এতে। বরাদ্দের অধিকাংশ লোপাট হয়েছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে, সেসবের কেনাকাটা করা হয়েছে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে, সেগুলোর অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। এমনকি যেসব ভেন্যু ভাড়া করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকটারই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, প্রকল্প পরিচালক আশরাফুন্নেছা নিজেই ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। দুদকের অভিযানের পর এসব সত্যতা মিললেও ঐ প্রকল্প পরিচালক এখনো বহাল তবিয়তে। তবে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আশরাফুন্নেছাকে সফরসঙ্গী রাখা হলেও দুদকের অভিযানের পর তার আর যাওয়া হয়নি।
বিভিন্ন প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও দুদক জানতে পেরেছে যে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন দুটি প্রতিষ্ঠানকে, যারা আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দুদকের সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ ও উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের অভিযানে দেখা যায় যে শর্ত ভেঙে একটি‘ প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বিল প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ৪৮৬টি কর্মশালা অনুষ্ঠানের বিষয়েও অনিয়মের সন্ধান পেয়েছে দুদক। বাস্তবে এসব কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়নি। কাগজে কলমে কর্মশালার আয়োজন দেখিয়ে বিল তুলে ফেলা হয়েছে। প্রতিটি কর্মশালায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে একজন কর্মকর্তার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হলেও সেখানে কেউ যাননি। তবে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন এমন দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কর্মশালার রিসোর্সপার্সন এবং স্থানীয় সমন্বয়কারীদের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, সেগুলোও নয়-ছয় হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে মৌলভীবাজারের কর্মশালার জন্য সাম্পান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ক্যাটারিং নামে একটি দোকান থেকে খাবার নেওয়া হয়েছে, যার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে স্টেশন রোড। বাস্তবে সেখানে এ ধরনের কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। এছাড়া স্টেশনারি কেনা হয়েছে আঁচল পেপার, স্টেশনারি অ্যান্ড লাইব্রেরি থেকে। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানেরও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য মৌলভীবাজার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তারা বিষয়েটি নিশ্চিত করেছে।
এদিকে প্রায় রকেট গতিতে চলেছে ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলার ৩৩টি উপজেলার প্রশিক্ষণের কাজ। মাত্র তিন দিনে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এটি একবারে অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অথচ ঢাকায় বসে অংশগ্রহণকারীদের স্বাক্ষর জাল করে অর্থ উঠিয়ে নেওয়া হয়।
এর আগে অধিদপ্তরের পরিচালক আশরাফুন্নেছা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেখানে একটি প্রকল্পে অর্থ আত্মসাত্ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ওএসডি করা হয়।
সামগ্রিক বিষয়ে আশরাফুন্নেছার সঙ্গে কথা বলতে তার দুটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু ইত্তেফাকের কথা শুনে তিনি লাইন কেটে দেন। এরপর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়নি।