এক গভীর অনিশ্চয়তায় পড়িয়াছে এই বত্সরের প্রায় ১৪ লক্ষ উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার্থী। বাড়িতেছে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠাও। পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি সেই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা অভিভাবকদেরও। এমনকি সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উপরই ইহা গভীর এক অনিশ্চয়তার খড়গ ঝুলাইয়া দিয়াছে। আমরা ইতিপূর্বে জানাইয়াছি যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শৃঙ্খলিত ইটের সারির মতো। ইহার একটির মধ্যে সমস্যা তৈরি হইলে তাহার প্রভাব অন্যটির উপর পড়িতে বাধ্য। করোনা এইবার সেই ইটের সারিতে প্রবল ধাক্কা দিয়াছে। ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা সৌভাগ্যবশত সম্পন্ন করা সম্ভব হইয়াছিল বটে। তবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্যাঁচে পড়িয়া গিয়াছে। পহেলা এপ্রিল হইতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা একযোগে শুরু হইবার কথা ছিল। কিন্তু তাহার পূর্বেই করোনা আসিয়া সাধারণ ছুটির ফাঁদ তৈরি করিল। অথচ, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—এই দুই পরীক্ষা আমাদের সমস্ত শিক্ষাপঞ্জির প্রধান দুইটি স্তম্ভ। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হইলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নূতন বর্ষের শিক্ষার্থী কোথা হইতে ভর্তি হইবে? সুতরাং বিষয়টি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গভীর সংকটের সৃষ্টি করিবে নিঃসন্দেহে। পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক সকলেই এখন দ্রুত পরীক্ষা গ্রহণের পক্ষে। কারণ, যত দেরি হইবে ততই পিছাইয়া পড়া অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হইতে ঝরিয়া পড়িবার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাইবে।
যদিও শিক্ষা বোর্ডগুলি ইতিমধ্যে উচ্চমাধ্যমিক, আলিম ও সমমানের পরীক্ষা গ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিয়া রাখিয়াছে, কিন্তু সরকারকেও জনস্বাস্থ্যের বিষয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় লইয়া সকল বিষয় যাচাই করিয়া দেখিতেই হইতেছে। তবে সরকার যদি মনে করে, করোনা পরিস্থিতি ঠিক হইবার পর উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা লওয়া হইবে—তবে তাহা হইবে উচ্চশিক্ষার অনিশ্চিত লকডাউনের মতো। আমরা প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রে দেখিয়াছি, সেইখানে এইবারের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অল্প কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা বাকি থাকিতেই করোনা দুর্যোগ নামিয়া আসে। শেষ পর্যন্ত কয়েক মাস অপেক্ষার পর দেশটির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বাকি পরীক্ষা না লইয়াই কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করিতে বাধ্য হয়। বাকি পরীক্ষা না গ্রহণের নেপথ্যে জনস্বাস্থ্যকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। এই উপমহাদেশের, বিশেষ করিয়া বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের করোনাবিষয়ক জটিলতা প্রায় একই রকম। এই কারণে সমস্যাগুলিও কাছাকাছি। আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেহ কেহ পরীক্ষার বিষয় কমাইয়া পরীক্ষা লইতে পরামর্শ দিতেছেন। কেহ বলিতেছেন মোট নম্বর অর্ধেক করিয়া পরীক্ষা লইতে। কাহারো মতে, পরীক্ষার কেন্দ্রসংখ্যা বৃদ্ধি করিয়া শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করিয়া পরীক্ষা লওয়া উচিত। কেহ বলিতেছেন, কয়েক দশক পূর্বের মতো সকাল-বিকাল পরীক্ষা লইতে। দ্রুত পরীক্ষা শেষ হইলে জনস্বাস্থ্য ও পরীক্ষার্থীদের মানসিক সন্তুষ্টি ঠিক থাকিবে।
করোনা পরিস্থিতি মাথায় রাখিয়া যদি সরকারকে পরীক্ষা লইতেই হয়, তাহা হইলে কীভাবে তাহা সম্পন্ন করা সম্ভব হইবে, সেই ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে কমিটি তৈরি করা উচিত। কিন্তু কথা হইল, মানুষের জীবন আগে নাকি পরীক্ষা? এই বিলিয়ন টাকার প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ নহে।