এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার চাকরিজীবনের শুরুতে যখন কোনো এক জেলায় কোনো এক স্কুলে কর্মরত ছিলেন, তখনকার ঘটনা বলছি। তিনি তখন ব্যাচেলর। রাত ১০টার দিকে তার রুমের কড়া নাড়লেন তিন ব্যক্তি। পরিচয়পর্বে জানা গেল তাদের একজন অসাধু সরকারি কর্মচারী এবং অন্য দুই জন দুই স্কুলের শিক্ষক। তারা এসেছেন উক্ত শিক্ষকের কাছে কিছু রোল নম্বর নিয়ে। কোনো একটি বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা উক্ত শিক্ষকের কাছে এসেছে। তিনি প্রস্তাব পেলেন যে রোল নম্বরগুলোতে A+ মার্কস দিতে পারলেই তাকে মালামাল করে দেওয়া হবে। তার বিয়ের পর ঘর সাজাতে কোনো চিন্তা থাকবে না। তারা তাকে বোঝালেন, জীবন গড়তে হয় এভাবেই। নিঃসন্দেহে জীবন গড়ার এটা কোনো সঠিক পন্থা নয়। কারণ এতে ধ্বংস হয় নিজের দেশ, নিজের জাতি।
দ্বিতীয় ঘটনাটি আমার খুব কাছের লোকের। লোকটি ছিলেন আমার নিকট আত্মীয়ের বাড়ির ড্রাইভার। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে তিনি তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সবটুকু জমিই বিক্রি করেছেন, তবু ছেলে কোথাও ভর্তি হতে পারেনি। এর মধ্যে দুই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে আমরা জানলাম তার ছেলে সেখানে চান্স পেয়েছে। আমরা সবাই খুশি। বললাম, ‘ছেলেটি অনেক মেধাবী হয়েছে।’ কিন্তু ঐ বছর প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষায় জালিয়াতির দায়ে সেই পরীক্ষা বাতিল হলো। তার পরে পুনঃপরীক্ষায় সে চান্স পায়নি। কিছুদিন আগে তার কাছ থেকেই জানতে পারলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য একটি চক্রের সঙ্গে তাদের কন্ট্রাক্ট হয়েছিল। পরীক্ষা বাতিল ঘোষণার এক দিন আগে ঐ চক্রের লোকেরা তার বাসায় এসে ৪ লাখ টাকা নিয়ে যায়। পরদিনই পরীক্ষা বাতিল ঘোষিত হয়। ঘটনাটি শোনার পর তাকে সমবেদনা জানানো ছাড়া আমার আর করার কিছুই ছিল না। কারন জীবন গড়ার যে অনিশ্চিত ও অবৈধ পথ তারা গ্রহন করেছিলেন, তা মোটেও কাম্য নয়।
এবার আসছি তৃতীয় ঘটনায়। আমার এক পরিচিত একদিন আমাকে ফোন করল যে তার দুই ছেলেকে বাংলাদেশ আর্মিতে টাইপিস্ট হিসেবে ভর্তির জন্য সবকিছু ঠিক। তারা যোগদানপত্রও পেয়েছে। যোগদান করার জন্য গিয়ে দেখে সবটাই ভুয়া। চাকরির বিষয়ে যোগাযোগকারী ব্যক্তিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় আমার শরণাপন্ন হয়েছে। আমি জিগ্যেস করলাম, চাকরি হওয়ার বিষয়ে এত নিশ্চিত হলেন কীভাবে ? তারা প্রথমে বলেন না। পরে বললেন, দুই জনের জন্য ৬ লাখ টাকা করে মোট ১২ লাখ টাকা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন দালাল চক্রের হাতে। জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারলাম, দালাল ব্যক্তিটি ক্যান্টনমেন্টের ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। চাকরিপ্রার্থীদের ছবিও দালাল চক্র আর্মির ড্রেস পরিয়ে তুলেছে। ঐ ছবি দিয়ে এডমিট কার্ড ইস্যু করার পরেই তারা টাকা দিয়েছে। এমতাবস্থায় বিশদভাবে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য আমার এক সামরিক অফিসার বন্ধুর কাছে কাগজটি পাঠিয়ে পরীক্ষা করে জানলাম যে সমস্ত বিষয়টিই ভুয়া। চাকরিপ্রার্থী ছেলে দুটির বাড়িতে পারিবারিক অশান্তি চরমে। এখানেই শেষ নয়, বড় ভাইকে আবার তার নিজের জমি বিক্রি করে ছোট ভাইয়ের ছেলের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। কারণ বড় ভাইয়ের ছেলের দেখানো পথেই ছোট ভাই তার ছেলের জন্য টাকা দিয়েছিল। তার ছেলের এই অবস্থার জন্য সে তার বড় ভাইয়ের ছেলেকেই দায়ী করেছে। এভাবে জীবন গড়ার পন্থা জীবন ও জাতি বিধ্বংসী।
একটি পরিসংখ্যানমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। বেকারের সংখ্যা সাড়ে চার কোটির বেশি। প্রতি বছর ২০-২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন। তাছাড়া বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। প্রতি ১০০ স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। এমতাবস্থায় সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আশ্বাস একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় বোঝা যায়, আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিদেশনির্ভর হতে হবে। এযুগে হয়তো নতুন কোনো দেশ আবিষ্কার করা সম্ভব নয়, কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নতুন কর্মক্ষেত্র খোঁজার জন্য আমাদের সবাইকে আন্তরিক থাকতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাঙালিদের চিন্তা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞান ও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। আমরা হয়তো জানিই না যে ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় ধনী দেশ রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশ আছে, যাদের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২৮ হাজার থেকে ১২ হাজার ইউএস ডলার পর্যন্ত। আরো একটি তথ্য যোগ না করলেই নয়, তা হলো ল্যাটিন আমেরিকার গড় বাত্সরিক মাথাপিছু আয় ১৬ হাজার ডলারের কম নয়। সেসব দেশে জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে সম্পদের কাড়াকাড়ি ও হিংসাবিদ্বেষ কম। এমন সব দেশে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও উদ্যোগ থাকতে হবে। এই মর্মে উক্ত দেশগুলোতে আমাদের কূটনৈতিক মিশন চালু করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি খরচ মনে হলেও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য সর্বোত্কৃষ্ট বিনিয়োগ। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমে মোট ৪১টি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করা যায়। এসব দেশে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাগুলোকেও কাজে লাগাতে হবে। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা, শিল্প ইত্যাদি নিয়ে ইয়েলো বুক তৈরি করতে হবে সরকারি উদ্যোগে। শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই তথ্য সংবলিত বইগুলো বিনা পয়সায় বিতরণ করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন গড়ার সুযোগ খুঁজে নিতে পারে। তাহলেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সাধিত হবে, ঘুচবে বেকারত্ব। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ঘুষ খাওয়া অন্যায়, বাঙালি শুনেছিল ঘুষ খাওয়া অন্য আয়।’ বেকার মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আজ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন ঘটছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকারকে বহির্বিশ্বে কর্মসংস্থানের প্রতিটি সম্ভবনাকে দেখতে হবে গভীর ও আন্তরিকভাবে। কথায় আছে, যে দৃষ্টির সঙ্গে মনের যোগাযোগ নেই, সে তো দেখা নয়, তাকানো। তাই আসুন, জাতি গড়তে প্রতিটি সম্ভাবনা গভীরভাবে দেখি।
n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর