মাছে ভাতে বাঙালি। মাছের রাজা ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে এক ঐতিহ্যগত যোগসাজশ। তাই বাঙালির নাগরিক উত্সব বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখের দিনে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ না হলেই যেন বাঙালিপনায় কমতি থেকেই যায়। এটা বাঙালির জাতীয় ধারা পরম্পরায় প্রবহমান। স্বাদে, গন্ধে ও ঐতিহ্যে ইলিশের এশিয়া মহাদেশীয় অন্যতম জন্মক্ষেত্র বাংলাদেশ তথা বঙ্গোপসাগর। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক ইলিশ যা ২০১৭ সালে স্বীকৃত হয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে। ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ নয়, এটা আমাদের একটি সম্পদও বটে। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে যার অবদান উল্লেখযোগ্য।
জাতীয় মাছ ইলিশের রয়েছে এক ব্যতিক্রমী জীবন চক্র। সমুদ্রের লোনা পানিতেই যার নিয়ত বসবাস, সেই ইলিশ প্রজনন মৌসুমে আশ্রয় নেয় নদীর বুকে। প্রজনন মৌসুমে (সাধারণত জুন-জুলাই ও অক্টোবর-নভেম্বর) সমুদ্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ছুটে মোহনা অভিমুখে। এ যেন সমুদ্রের নদী গর্ভে অনন্য দান। আর বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা ও এদের শাখা নদীগুলো হয়ে ওঠে ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। সেই সুবাদে নদীমাতৃক প্রবহমান বাংলার নানা উত্সবে এবং অতিথি আপ্যায়নে ইলিশ মাছ হয়ে ওঠেছে এক অনন্য অংশীদার। ইলিশ শুধু স্বাদে-গন্ধে নয়, পুষ্টি গুণেও সমৃদ্ধ। তাই এটা ভিটামিন এ ডি এবং ইয়ের এক সমৃদ্ধ উত্স। তাছাড়া ইলিশ মাছে রয়েছে আয়োডিন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও লৌহসহ আরো অনেক প্রয়োজনীয় খনিজ ও ভিটামিন যা মানব শরীরকে সুস্থ ও মানসিক বিকাশের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ইলিশ মাছ হূদেরাগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে জাতীয় মাছ ইলিশ দেশের অর্থনীতির এক সোনালি ক্ষেত্র। পৃথিবীর মোট ইলিশ উত্পাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ উত্পন্ন হয় বাংলাদেশে। সেই সুবাদে বাংলাদেশের উপকূলীয় মত্স্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় ৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও খুচরা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে উপকূলীয় দ্বীপ ও চরাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তাছাড়া, দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসে ইলিশ থেকে। মোট মত্স্য উত্পাদনের ১২ ভাগই হচ্ছে ইলিশ। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ইলিশের উত্পাদন প্রায় ৫ লাখ টনের বেশি। আর ইলিশের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সারা দেশেই। তাই ইলিশ রপ্তানি অর্থনীতির এক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। আর প্রজননকালীন ‘মা’ মাছ ও জাটকা (২৩ সেন্টিমিটারের কম) রক্ষায় বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে নিষিদ্ধকালীন নিবন্ধন জেলেদের ভিজিএসের (ভারনারেবল গ্রুপ ফিডিং) আওতায় পরিবার প্রতি ২০ কেজি চাল প্রদান ও পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রয়াস অন্তর্ভুক্ত যা দেশের ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির সহায়ক। পাশাপাশি সরকারকে ইলিশ মৌসুমে ব্যাপক গণসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস নিতে হবে। তাছাড়া সম্প্রতি ইলিশের গ্রীষ্মকালীন (জুন-জুলাই) ফলনও বেশ ভালো। আর যা করোনাকালীন ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য আশা জাগানিয়া। তাই এই অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রকে আমাদের এই দুর্দিনে কাজে লাগানোর জন্য সরকারকে অগ্রবর্তী হতে হবে। মোদ্দাকথা এই জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়