রাইড শেয়ারিংয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে

হুসেইন মোহাম্মদ ইলিয়াস

 

আপনাদের ভালোবাসাতেই পাঠাও আজ দেশের সর্ববৃহত্ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশীয় রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পেরেছে। তথ্য-প্রযুক্তি সহায়ক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং ছাড়াও ফুড ডেলিভারি, ই-কুরিয়ার ডেলিভারি, ই-কমার্স, হেলথ ও এন্টারটেইনমেন্টসহ আরো বেশ কিছু সেবা আমরা অ্যাপ ব্যবহারকারী ও গ্রাহকদের কাছে নিয়ে আসতে পেরেছি। আজকের এই লেখার বিষয়বস্তু মূলত রাইড শেয়ারিং, বিশেষ করে বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিংয়ের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যত্। 

২১ জুন ২০২০ ইং তারিখে বিআরটিএ কর্তৃক প্রেরিত নির্দেশের সারমর্ম হলো মোটরসাইকেল ব্যতীত শুধুমাত্র রাইড শেয়ারিং এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ২৫৫টি গাড়ি (ফোর হুইলার) দিয়ে রাইড শেয়ারিং করা যাবে। অর্থাত্ ঢাকা শহরের ২ কোটিরও বেশি মানুষ মাত্র ২৫৫টি গাড়ির মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস গ্রহণ করতে পারবে। 

করোনার কারনে গত ২৬ শে মার্চ ২০২০ ইং তারিখ থেকে সরকার দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তখন বিআরটিএ’র নির্দেশনা মোতাবেক অন্য সকল গণপরিবহনের মতো রাইড শেয়ারিং সেবাও বন্ধ রাখা হয়। ফলে হিসেব করলে দেখা যায় যে, ডিসেম্বর ২০১৯ ইং থেকে করোনার (কোভিড ১৯) কারনে ২৬ শে মার্চ ২০২০ ইং তারিখে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত রাইড শেয়ারিং মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট প্রাপ্তির জন্য মাত্র চার মাসেরও কম সময় পাওয়া গেছে। সাধারণ ছুটি শেষে গত ০১ জুন থেকে সরকারি নির্দেশে সকল ধরনের গণপরিহন আবার চালু করা হয়। মোটরগাড়ি, নৌযান, ট্রেন, এমনকি বিমান চলাচলও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু রাইড শেয়ারিং। গত ৩০ মে ২০২০ ইং তারিখে বিআরটিএ থেকে আমাদের চিঠি দিয়ে রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ থাকবে বলে অবহিত করা হয়।

(কোভিড-১৯) একটি বৈশ্বিক দুর্যোগ। বিশ্বের অনেক দেশে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকলেও সেখানে রাইড শেয়ারিং চালু রাখা হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র বাংলাদেশ; এখানে রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। এজন্য গত ১ জুন ২০২০ ইং তারিখে বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিংয়ের মতো একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেবা অব্যাহত রাখার অনুমতি প্রদানের জন্য আমরা (পাঠাও, উবার ও সহজ যৌথভাবে) বিআরটিএ-কে অনুরোধ জ্ঞাপন করি। 

উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে করোনার সময়ে কিভাবে নিরাপদে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস প্রদান করা হবে সে বিষয়ে জানতে চেয়ে গত ৪ জুন ২০২০ ইং তারিখে বিআরটিএ আমাদেরকে একটি পত্র প্রেরণ করে। বিআরটিএ’র উক্ত পত্রের সূত্রে দেশের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম খাতের সর্ববৃহত্ সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর সহায়তায় আমরা একটি এসওপি (স্ট্যার্ন্ডাড অপারেটিং প্রসিডিওর) প্রণয়ন করি। করোনার সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেসব নিয়ম প্রতিপালন করা হয় এবং এ সংক্রান্ত আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টেকনিক্যাল গাইডলাইনসমূহ বিবেচনাপূর্বক উক্ত এসওপিটি প্রণয়ন করা হয়। উক্ত এসওপিটিতে আমরা চালক ও যাত্রী উভয় কর্তৃক মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছি, তা না মানলে অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। 

১৮ই জুন ২০২০ ইং তারিখে একটি জাতীয় পত্রিকায় রাইড শেয়ারিং সার্ভিস সংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। উক্ত সংবাদ থেকে আমরা অবগত হই যে উবার এর গ্লোবাল অফিস বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস সংক্রান্ত একটি সভায় মিলিত হতে যাচ্ছে। ২০ শে জুন ২০২০ ইং তারিখে অনলাইনের মাধ্যমে উক্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই সভায় কোন দেশীয় কোম্পানীকে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা হয়নি। সকল দেশীয় রাইড শেয়ারিং কোম্পানীকে পাশ কাটিয়ে উবার কর্তৃক এককভাবে রাইড শেয়ারিং সংক্রান্ত উক্ত সভার আয়োজন ছিল নিতান্তই অনভিপ্রেত রাইড শেয়ারিংয়ের বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে মূলত দুইটি কারণ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। যথা—

n মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট বিষয়ে হঠাত্ কড়াকড়ি।

n করোনার সময় অনুসরণযোগ্য স্বাস্থ্যবিধির বাস্তবায়ন।

করোনা দুর্যোগের এই মাঝামাঝি সময়ে প্রথম নিয়মটির বাস্তবায়নে হঠাত্ কড়াকড়ি আরোপের অর্থ রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত চালকদের রুটি-রুজির উপর মারাত্মক আঘাত করা। আমরা সকলেই জানি যে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে যুক্ত অধিকাংশ চালক গত প্রায় ০৩ মাস যাবত্ কোন ধরনের আয়-রোজগার করতে পারছে না। হাজার হাজার চালক বেকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। 

বিআরটিএ’র প্রতি আমাদের আকুল আবেদন যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণপূর্বক অবিলম্বে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস চালুর অনুমতি প্রদান করুন। তাহলে করোনার কারনে হঠাত্ বেকারে পরিণত হওয়া হাজার হাজার চালক তত্ক্ষণাত্ রাইডশেয়ারিং সেবায় যুক্ত হতে সক্ষম হবেন। ফলে, নিদারুন অর্থকষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করা উক্ত চালকবৃন্দ রাইড শেয়ারিং হতে অর্জিত দৈনিক আয়ের মাধ্যমে পরিবার-পরিজন নিয়ে কিছুটা হলেও জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। 

 

লেখক :সিইও ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা, পাঠাও লিমিটেড। কো-কনভেনর, বাংলাদেশ রাইড শেয়ারিং এসোসিয়েশন (বারসা)।