মাত্র ১ হাজার ৪৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট ঢাকা শহরে করোনা-দুর্যোগের পূর্বে প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ বাস করিত। জাতিসংঘের গত বত্সরের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল শহরের তালিকায় সপ্তম স্থানে ঢাকা। তবে ঘনবসতির হিসাবে ঢাকা বিশ্বে এক নম্বরে। বাসস্থানের সংকট ঢাকার এক অনিবার্য সমস্যা বহুদিনের। কিন্তু করোনা আসিয়া ঢাকার চিত্র অনেকখানি পালটাইয়া দিয়াছে। নূতন বাস্তবতা এমন যে, ঢাকার ৩৬ শতাংশ মানুষ চাকরি বা কাজের সুযোগ হারাইয়াছে। ৩ শতাংশ লোক চাকরি থাকিলেও বেতন পান নাই। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যাহারা কাজ করেন, তাহাদের ৬২ শতাংশই কাজের সুযোগ হারাইয়াছেন। করোনার কারণে ঢাকার মানুষের আয় কমিয়াছে ৬০ শতাংশ। এমনটি জানা গিয়াছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত জরিপে।
ঢাকায় এখন টু-লেটের ছড়াছড়ি। মানুষ বড় বাসা ছাড়িয়া ছোট ও কম ভাড়ার বাসায় উঠিতেছে। বড় একটি অংশ, যাহারা কাজ হারাইয়াছেন, অদূর ভবিষ্যতে কাজ না পাইবার আশঙ্কায় সমগ্র পরিবার লইয়া গ্রামে চলিয়া গিয়াছেন। ইহাদের পাশাপাশি সমস্যায় পড়িয়াছে শিক্ষার্থীরা। ঢাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মেস করিয়া থাকেন। কোনো বাসায় হয়তো অনেকে মিলিয়া থাকেন, তাহাদের মধ্যে করোনার জন্য কেহ কেহ চলিয়া গিয়াছেন। সিট ফাঁকা হইয়া গিয়াছে। অনেকের প্রাইভেট-টিউশনি বন্ধ হইয়া গিয়াছে, ফলে তাহাদের পক্ষে আর বাসা ভাড়া দেওয়া সম্ভব হইতেছে না। বাড়িওয়ালারা কোথাও তিন মাসের বাড়তি ভাড়া দিয়া শিক্ষার্থীদের বাসা ছাড়িতে বলিতেছেন। কোথাও শিক্ষার্থীদের সহিত বাসার মালিকের ঝগড়ার ঘটনা ঘটিতেছে। এই ধরনের বিবিধ সমস্যায় বিপাকে পড়িয়াছেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। বিশেষ করিয়া নারী শিক্ষার্থীরা। একটি জাতীয় দৈনিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রীর বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত দুর্ভোগের রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। সেইখানে বলা হইয়াছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই পরিস্থিতির মধ্যেও ছাত্রীদের সহায়তায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে যাহার যাহার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করিতেছেন। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উচিত সংশ্লিষ্ট এলাকার সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বাসার মালিকপক্ষের সহিত আলোচনার মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যার সমাধান করা। কারণ, দিন যত যাইতেছে এই ধরনের সমস্যা ততই বাড়িতেছে।
ইহা ঠিক যে, সকল বাড়িওয়ালাই খারাপ নহেন। অনেকেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেকটা ছাড় দিতেছেন। ইহার বিপরীতে অনেকে এক পয়সাও ছাড় দিতেছেন না। আর ঢাকা শহরের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই ভাড়া বাসায় থাকেন। অনেক বাড়িওয়ালার একমাত্র উপার্জনের উত্স হইল বাড়িভাড়া। সুতরাং এই সময়ে বাড়িওয়ালারা ছাড় না দিলে সবাই মিলিয়া দল বাঁধিয়া যদি ঢাকা ছাড়ে, তাহা হইলে কাহাকে তাহারা বাসা ভাড়া দিবেন? মনে রাখিতে হইবে, করোনা এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি করিয়াছে। বর্তমান জীবদ্দশায় পৃথিবীর কোনো মানুষ এমন জটিল অবস্থা ইতিপূর্বে দেখে নাই। এই সংকটকালে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের পরিপূরক। একে অপরের সহযোগিতার মাধ্যমেই এই দুর্যোগকে মোকাবিলা করিতে হইবে।