অণুগল্প

মুখোশ

আন্না পুনম

 

বুকের ভেতর চাপ চাপ কষ্ট অনুভব করছে মিঠু। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। কুয়াশার ঘন প্রলেপ আরো দুর্বোধ্য করে দিয়েছে পথ। এ তো নৌপথ! উত্তাল ঢেউ। দুলছে জাহাজ। পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে জাহাজটি। মিঠু শক্ত করে ধরে রেখেছে মাস্তুল। তার পাশে চিত্কার করে কে যেন কী বলছে। চিনতে পারছে না মিঠু। মনে হয় অফিসের বস। কী বলছেন বোঝা যাচ্ছে না। সমুদ্রের গর্জনে হারিয়ে যাচ্ছে শব্দ। কিন্তু মায়ের কণ্ঠ ঠিক শুনতে পাচ্ছে মিঠু, বাজান ঘরে আয়। ভিজ্যা যাইবি।

আম্মা আপনে না মইরা গেছেন?

না রে বাজান। মরমু ক্যান— এই তো আছি তোর পাশে। ধর আমারে ধর, শক্ত কইরা ধর।

আম্মা আমার ভয় লাগতেছে। আমারে ধরেন। আমি ডুইবা যাইতেছি। আম্মা। আম্মা।

মিঠু, মিঠু, প্লিজ তাকাও। খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার? এই তো চলে আসবে অ্যাম্বুলেন্স।

সুষমা মিঠুর মাথাটা নিজের কোলে টেনে নেয়। বুকে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, যদি শ্বাসকষ্ট কিছুটা কমে। অ্যাম্বুলেন্স এলে স্ট্রেচারে তুলে নেয়া হলো মিঠুকে। সুষমা যেতে পারে না সঙ্গে। করোনাকালীন অ্যাম্বুলেন্সে কারো সঙ্গী হওয়ার নিয়ম নেই। কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে মিঠুকে। তার করোনা পজিটিভ।

প্রিয় পাঠক গল্পটা এখানেই শেষ বা শুরু হতে পারত। কিন্তু করোনা মহামারিতে মানুষ যখন একটু নিশ্বাস ফেলার জন্য হাসপাতালে যুদ্ধ করছে, ঠিক তখন মিসেস শায়লার লিপস্টিক ঘিরে একদল মাছি ভনভন করছে।

হ্যালো তুমি কি রাতে ফিরবে?

কী যে বলো। এ সময় কী করে ফিরি বাসায়। প্রায় পঁচিশটি রিপোর্ট দিতে হবে সকাল দশটা নাগাদ। ক্লিনিকেই থেকে যাব আজ রাতটা।

বেশ। সাবধানে থেকো। স্যাম্পলগুলো নিজে হ্যান্ডেল কোরো না।

চিন্তা কেরো না, ওসব শামীম সামলে নিচ্ছে। গুডনাইট।

গুডনাইট অ্যান্ড টেক কেয়ার।

শায়লা-নাজিম দম্পতি ডাক্তার। মিঠু ব্যাংকার আর ওর স্ত্রী সুষমা গৃহবধূ। নাজিম দম্পতির ক্লিনিকে মিঠু করোনা টেস্ট করিয়েছিল। ফলাফল এসেছিল নেগেটিভ। মিঠু হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে! আমরা জানি না মিঠু বাঁচবে নাকি মারা যাবে।

প্রিয় পাঠক মিঠুর সঙ্গে লড়ছে বাংলাদেশ। আর পাকিহানাদার শায়লা-নাজিমরা নিত্য নতুন মাস্ক পরে আমাদের ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চিনতে পারছি না ওদের।

রাস্তায় ফেরিঅলা হাঁকছে, মাছ রাখবেন মাছ। সুষমা বুঝতে পারে না ফেরিঅলা কী হাঁকছে—মাস্ক নাকি মাছ? ঠিক যেমন চিনতে পারছি না মুখোশের আড়লে অমানুষদের।