অপেক্ষা ছাড়া উপায় কী

একটি ভয়ংকর ছোঁয়াচে ভাইরাসের মরণগ্রাস হইতে রক্ষা পাইতে সারা বিশ্ব চাতকের মতো চাহিয়া রহিয়াছে একটি কার্যকর টিকার জন্য। টিকা তো খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নহে। এইচআইভি প্রথম শনাক্তের পর আশা করা হইয়াছিল বত্সর দুয়েকের মধ্যেই কার্যকর ভ্যাকসিন বাহির হইয়া যাইবে। কিন্তু তাহা তিন যুগেও হয় নাই। এখনো ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন ভাইরাসঘটিত অসুখের কোনো কার্যকর টিকা নাই। সুতরাং করোনার বিরুদ্ধে একটি সফল টিকা আবিষ্কার করা খুব সহজ বিষয় নহে।

তবে করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বকে যেইভাবে প্যাঁচাইয়া ধরিয়াছে, সেই প্যাঁচ হইতে মুক্তি পাইতে সারা বিশ্ব কোমর বাঁধিয়া নামিয়াছে। বিশ্ব জুড়িয়া প্রায় ১৫০টির বেশি টিকা তৈরি ও পরীক্ষার কাজ চলিতেছে। বর্তমানে ২৩টি টিকা মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হইতেছে। আর এই ক্ষেত্রে গত সোমবার বিশ্বখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল আমাদের আশার বাণী শুনাইয়াছে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের ব্যাপারে। ল্যানসেট বলিতেছে, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির একটি ডোজ ব্যবহার করিবার পরই প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হইয়াছে। বাকি ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে ঐ অ্যান্টিবডি তৈরি হইতে লাগিয়াছে দুইটি ডোজ। ইহা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ যে, প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকরা আশা করিতেছেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি নিরাপদ হইবে। তবে ভ্যাকসিনটি পুরোপুরি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নহে। এই ভ্যাকসিন প্রয়োগে ৭০ শতাংশের পরবর্তী সময়ে জ্বর বা মাথাব্যথা অনুভূত হইয়াছে। যদিও তাহা সাধারণ প্যারাসিটামল দিয়াই সামাল দেওয়া গিয়াছে। তবে, করোনার সমগ্র রহস্য এখনো অধরা। একবার কাহারো কোভিডের সংক্রমণ ঘটিলে তাহার শরীরে যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তাহার মেয়াদ তিন মাস থাকে মাত্র। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে তাহাই। অ্যান্টিবডির কাজ হইল ভাইরাসটির পুনরায় সংক্রমণ হইলে তাহার বিরুদ্ধে লড়াই করা। আশার বিষয় হইল, অক্সফোর্ডের টিকায় কেবল অ্যান্টিবডি নহে, কার্যকর টি-সেলও তৈরি করিতে সক্ষম। এই টি-সেল হইল অনেকটা ‘মেমরি চিপের’ মতো। ইহা ভাইরাসের সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিজের স্মৃতিতে রাখিয়া দেয়। অর্থাত্, ভবিষ্যতে ফের কোনো কোষ ঐ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হইলেই টি-সেল সক্রিয় হইয়া উঠে এবং সেই মতো খবর পাঠায় শরীরের রোগপ্রতিরোধ সিস্টেমকে। তাহার পরেই পুরাতন চিনা শত্রুর বিরুদ্ধে শুরু করে হামলা। এই ‘টি-সেল’ বহু বত্সর ধরিয়া শরীরে বহাল থাকে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালাইতে পারে। আরো একটি আশার কথা হইল, অক্সফোর্ডের পাশাপাশি মার্কিন ঔষুধ কোম্পানি ফাইজার ও জার্মান জৈব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বায়ো এন টেকের পক্ষ হইতেও গতকাল বলা হইয়াছে যে তাহাদের টিকা নিরাপদ বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে।

অক্সফোর্ড প্রথম বাধা টপকাইয়া গিয়াছে। তবে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হইবে। পরীক্ষামূলক প্রয়োগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের ৪৭ হাজার মানুষের দেহে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন দেওয়া হইবে। ইহার পর ‘চ্যালেঞ্জ ট্রায়াল’ বলিয়া আরো একটি ধাপ রহিয়াছে। এই সকল ধাপ সাফল্যের সহিত পার হইবার পরই বাজারে আসিবার অনুমতি পাইবে করোনার ভ্যাকসিন। অর্থাত্ সকল কিছু ঠিকঠাক চলিলে আগামী বত্সরের শুরুতে কোভিডের টিকা পাওয়া যাইতেও পারে। সেই মতো অপেক্ষা ছাড়া উপায় নাই।