ভেজাল খাদ্য :চাই সচেতনতা ও আইনের প্রয়োগ

আর কিছুদিন পরেই আসিতেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। বাঙালি মুসলমান সমাজে ঈদের দিনে সেমাই রান্না করাটা সংস্কৃতির অংশ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এই সেমাই যদি অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি করা হয়, তাহা হইলে ইহা খাইয়া অসুস্থতার কারণে ঈদের আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হইতে পারে। ভেজাল খাদ্য তৈরির মন-মানসিকতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আজ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। ভাবিতেও অবাক লাগে যে ভেজালকারীরা সেমাইয়ে ব্যবহার করে কাপড়ের রং, পোড়া তেল ও নিম্নমানের অন্যান্য খাদ্য উপকরণ। ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই, নিমকিসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী তৈরির অভিযোগে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সাভারের পৌর এলাকায় অভিযান চালাইয়া দুই কারখানার মালিককে ৪ লক্ষ টাকা জরিমানা করিয়াছে। অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড প্রদান করা হইয়াছে। একটি কারখানার যে স্থানে চানাচুর তৈরি করা হইত, সেইখানে বাধা ছিল ভেড়ার দল এবং ভেড়ার বিষ্ঠা খাবারে মিশিয়া যাইতে দেখা গিয়াছে। মানুষের জন্য খাদ্য তৈরিতে ইহা কোন ধরনের অবহেলা?

বর্তমানে আমাদের দেশে এমন কোনো খাদ্য নাই যেইখানে ভেজালের সংমিশ্রণ দেখা যায় না। বলিতে গেলে ভেজাল খাদ্য খাইতেই আমরা অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি। ইহার কারণে ইদানীং মানুষের মধ্যে বিভিন্ন জটিল অসুখ-বিসুখও বাড়িয়া গিয়াছে। আমাদের দেহটা আসলে একটা ইঞ্জিনের সহিত তুলনীয়। ইঞ্জিন জ্বালানি পোড়াইয়া শক্তি উত্পাদন করে এবং সেই শক্তি দিয়াই চলে। আমাদের দেহের সব ধরনের কাজের জন্যও শক্তি দরকার। আর এই শক্তি আসে খাদ্য হইতে। সেই খাদ্যই যদি ভেজাল ও বিষযুক্ত হয়, তাহা হইলে দেহ রোগাক্রান্ত হইবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের শতকরা ৬৩ ভাগ অপুষ্টির জন্য দায়ী অপর্যাপ্ত খাদ্য ও ভেজাল খাদ্য।

খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হইতেছে, জরিমানা আদায় করা হইতেছে, তথাপি খাদ্যে ভেজাল কমিতেছে না। তাহা হইলে গলদটা কোথায়? এখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উদ্দেশ্য যদি হয় শুধু জরিমানা আদায় করা, তাহা হইলে এই সমস্যার সমাধান কখনো হইবে না। কেননা, যাহারা এমন কাজ করে, তাহারা জরিমানার চাইতেও বহুগুণ অর্থ আয় করিয়া থাকে অবৈধ পন্থায়। এই বিষয়ে সমন্বিত আইন না থাকাটাও একটি সমস্যা। আমাদের জানামতে, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে এই দেশে আইন আছে। সর্বশেষ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে এমন অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বত্সরের কারাদণ্ড ও ২০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রহিয়াছে। ইহাকে অনেকে অপর্যাপ্ত মনে করেন এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখিয়া নূতন আইন প্রণয়নের দাবি তাহাদের। মূলত এই সংক্রান্ত আইনের বাহুল্য, দুর্বলতা ও ব্যর্থতা দূর করিতে না পারিলে এবং এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা না বাড়িলে খাদ্যে ভেজাল দূর করা সত্যিই কঠিন।