বিশেষায়িত স্কুল :বাস্তবতা এবং শিক্ষকদের বঞ্চনা

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশেষ শিক্ষার বিবর্তনের ফলে বিশেষ প্রশিক্ষার্থীদের (প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী) বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, জীবনমুখী শিক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে তাদের সামাজিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর মূল কারণ বহমান শিক্ষাব্যবস্থায় একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য যে ধরনের সহায়তা প্রদান করে, তার বাইরে অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হয় বিশেষ শিক্ষার্থীদের। সৌভাগ্যক্রমে এদেশে এমন বিশেষায়িত স্কুল রয়েছে, যা বিশেষ শিশুদের সবটুকু চাহিদা পূরণের সক্ষমতা রাখে।

বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীবান্ধব সরকার। বিগত ১১ বছরে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানগত দিক দিয়ে এ দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এখন অনেকাংশে অগ্রসরমান। এর পেছনের মূল কারণ বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য দুটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ, দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, একই সঙ্গে একীভূত, সমন্বিত ও বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন, প্রতি জেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র স্থাপন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান, অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণ কার্যক্রম, চাকরির ক্ষেত্রে বয়স শিথিলসহ বহুল প্রতীক্ষিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা-২০০৯কে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সময়োপযোগী করে ২০১৯ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত অনুমোদন করা। এর মূল উদ্দেশ্য এক. যেসব প্রতিবন্ধী শিশু (মাঝারি ও চরম মাত্রার) বিশেষত এনডিডি, অর্থাত্ অটিজম, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন্স সিনড্রোম ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত, তাদের জীবন দক্ষতার পাশাপাশি নমনীয়ভাবে মূলধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা; দুই. যেসব শিশুর পক্ষে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মূলধারায় যাওয়া সম্ভব নয়, তাদের আগ্রহ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, যাতে পরিবারের বোঝা না হয়ে নিজের জীবন নিজেই পরিচালনা করতে পারে; তিন. যেসব শিশু চরম ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতার শিকার, তাদের সামাজিক জীবন নিশ্চিতকরণে দৈনন্দিন জীবন কার্যাবলি (ডিলএ) শিক্ষা প্রদান করা এবং চার. সাধারণ, একীভূত ও বিশেষায়িত—এই ত্রিমাত্রিক উদ্যোগে শতভাগ প্রতিবন্ধী শিশুকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। এই নীতিমালার আলোকে সরকারের সিদ্বান্ত ছিল সারাদেশে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও চলমান বিশেষায়িত স্কুলগুলোর মধ্যে থেকে প্রতি উপজেলায় একটি করে স্কুলকে স্বীকৃতি প্রদান, পূর্বে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুলকে এমপিওভুক্তকরণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুলগুলোকে এমপিওভুক্ত করা। কিন্তু এর সুফল এখনো মেলেনি। এ লক্ষ্যে সরকার অতীতে কয়েক দফায় স্কুলগুলো অডিট করিয়েছে, স্কুলের যাবতীয় কাগজপত্র জমা নিয়েছে ,কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ২০০৯-২০১৬ সাল পর্যন্ত কিছু স্কুলকে স্বীকৃতি প্রদান করেছে কিন্তু অদ্যাবধি এমপিওভুক্ত করেনি। ২০১৭ সাল থেকে অদ্যাবধি স্বীকৃতি প্রদান বন্ধ রেখেছে। পুনরায় ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে স্কুলগুলোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুলের এমপিও এবং দীর্ঘ বছর স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা স্কুলগুলোর স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করে। এই পর্যায়েও ছয় মাস গত হয়ে গেল, প্রতিবন্ধী স্কুল শিক্ষক-কর্মচারীগণ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখছে না।

বিগত বছরগুলোতে সারা দেশে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৬২টি স্কুল এবং সরকারি স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা ১ হাজার ২০০টি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ২৮ হাজার ৫৫০ জন শিক্ষক-কর্মচারী সরকারি তরফ থেকে কোনো ধরনের বেতন বা ভাতা বা থোক বরাদ্দ, এমনকি সামান্য সম্মানীও পাননি। কারোনার ক্রান্তিকালে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার ইতিমধ্যে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষক, কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকসহ শত হাজার কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেছে। আমরা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে দেশের লক্ষাধিক শিক্ষাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী শিশুর পাশে থাকা প্রতিবন্ধী স্কুলের বেতনবিহীন ২৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীগণ এই বৈরী সময়ে সরকারের তরফ থেকে তাদের জন্য বিশেষ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি ১০ বছর ধরেই বিশেষায়িত স্কুলগুলো শুধু অডিট, পর্যবেক্ষণ আর আশ্বাসের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে। এ পর্যন্ত না হলো স্বীকৃতি, না হলো কিছু স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুলের এমপিওভুক্তি। দীর্ঘ সময় বিশেষায়িত স্কুলগুলোর স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি না থাকার কারণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ থেকে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীগণ আর্থিক ও অ-আর্থিক সেবা থেকেও বঞ্চিত। এমতাবস্থায় প্রতি উপজেলায় একটি করে বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি প্রদান, ইতিমধ্যে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্তকরণ এবং প্রতিবন্ধী স্কুল শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান। প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপে অচিরেই প্রতিবন্ধী স্কুলশিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘকালের না পাওয়া বঞ্চনার অবসান হবে এ প্রত্যাশা রাখছি।

n লেখক :প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক লেখক,

গবেষক ও প্রশিক্ষক