আসিফ আহমেদ
মহামারি করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) সারা বিশ্বে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশ্বের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। সকলের মনেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে। ইতিহাস বলে, মহামারির দ্বিতীয় ধাপ দুর্ভিক্ষ। করোনায় বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মহামন্দার চেয়েও খারাপ হতে পারে। মহামারি করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। দেশের প্রতিটি খাতই এখন ক্ষতির মুখে।
রপ্তানিতে প্রভাব :বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র হলো—এই পণ্যটির প্রধান বাজার। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ৬২ ভাগ আসে ইউরোপ একং ১৮ ভাগই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এরইমধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে সেখানকার বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
এছাড়াও চীনে কাঁকড়া, কুচে ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে, যার ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতেও ধস নেমেছে। সংকুচিত হয়ে আসছে ওষুধ শিল্প, পাট, সুতা, হোম টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক্স, সামুদ্রিক মাছ ও প্রসাধুনী শিল্পের রপ্তানি বাজার।
রেমিট্যান্সে প্রভাব : বাংলাদেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স থেকে। জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান প্রায় ১২ শতাংশের মতো। দেশের অর্থনীতিতে বেশির ভাগ সূচক নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ ভাগ বেশি। কিন্তু গত দুই মাস যাবত্ কমছে শুরু করেছে রেমিট্যান্সের পরিমাণ।
বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে, সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিক বা ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনমতো আয় করতে পারবে না এবং দেশে পরিবারের কাছে আগের মতো টাকা পাঠাতে পারবেন না। তাই স্বভাবতই রেমিট্যান্স কমতে থাকবে এবং এর প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
পর্যটন খাতে প্রভাব : বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্ব জুড়ে চলা পর্যটন ভাটার কারণে এরইমধ্যে বাংলাদেশও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটনপ্রেমীরা অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন। কিন্তু এবার বছরের প্রথম থেকেই বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা তাদের বুকিং ও ফ্লাইট বাতিল করেছেন। করোনা আতঙ্কে বিদেশি পর্যটকদের এদেশে আসা কমে যাবে। তাছাড়া দেশীয় ও অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যাও করোনা ভাইরাসের প্রভাবে হ্রাস পাবে, যা পর্যটন সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।
এ দেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকা শক্তি হলো—রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। যদি রপ্তানি আয় কমে যায়, তাহলে দেশের শিল্প কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়া বা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
অন্যদিকে প্রবাসীরা টাকা পাঠানো যদি কমিয়ে দেয়, তাদের পরিবার দেশে আগের মতো খরচ করতে পারবেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর এবং কমে যাবে বেচাকেনা। আর চাহিদা কমে গেলে ভোক্তা পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ক্ষতির মুখে পড়বে।
এভাবে বাংলাদেশে করোনার আগের চেয়ে পরের সংকট তীব্র হতে পারে। বিশ্বমন্দার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আসতে পারে নাটকীয় পরিবর্তন। বেড়ে যেতে পারে সামাজিক দূরত্ব ও অস্থিরতা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখা দিতে পারে।
দেশে বেকারত্ব তৈরি হবে এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তে পরিণত হবে। তাই আসন্ন সংকট থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য সরকারের সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়