আমরা কি প্রতি বছর বানের পানিতে ভাসব?

মো. মামুন

বন্যার সময় বন্যার্ত মানুষের পরিস্থিতি যে কী ভয়াবহ হয় তা পত্রিকা কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে বন্যার খবর দেখে শুধু কল্পনা করা যাবে মাত্র কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। যারা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে শুধু তারাই বোঝেন যে বন্যার সময় বেঁচে থাকার লড়াইটা কতটা কঠিন হয়। রাস্তায় পানি, বাড়ির আঙিনায় পানি, ঘরের ভিতরে পানি, পায়খানায় পানি, ময়লা ভেসে বেড়াচ্ছে যেখানে-সেখানে, রান্নাঘরে পানি, নলকূপ তলিয়ে গেছে পানির নিচে, ঘরের জিনিসপত্র ভেসে বেড়াচ্ছে। রাতে ঘুমানোর জায়গাটুকুও থাকে না অনেকের। নিজেদের জীবন বাঁচার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয় গবাদিপশুর জীবন বাঁচার সংগ্রামও। এসব গবাদিপশু অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। তাদেরকে তো আর ফেলে দিতে পারে না। বন্যার সময় অনেকের নিজ ঘরে পানি ওঠার কারণে বসবাসের মতো আর উপযোগী থাকে না। এদিকে গবাদিপশুর থাকার ঘরেও পানি ওঠে। ফলে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু কোনো রাস্তায় কিংবা স্কুলঘরে সেই গবাদিপশুর সঙ্গে রাত কাটাতে হয়। অনেকের ঘরে সামান্য কিছু ধান-চাল থাকলেও সেগুলো নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাদের। এমন কোনো শুকনা জায়গা পাওয়া যায় না যেখানে ঘরের অন্য জিনিসপত্রগুলো রাখা যাবে। অনেকে বাধ্য হয়ে উঁচু কোনো রাস্তা কিংবা দূরের উঁচু কোনো জায়গায় সেসব রেখে আসতে বাধ্য হয়। ঘরবাড়ি ছাড়া বসবাস করা এ মানুষগুলোর শুরু হয় নিজের খাবার সংগ্রহের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাবার সংগ্রহের সংগ্রাম। অনেকের ঘরে খাবার মজুত থাকে না।

সারা দেশে করোনা মহামারির সময়ে শহরে কাজ হারিয়ে অনেক শ্রমিক বাড়িতে বেকার বসেছিলেন। অনেকের সঞ্চয় যা ছিল তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক আছেন যারা শহরে এসে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। কেননা করোনা পরিস্থিতিতে এখনো শহরেও অনেক কাজ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে আবার এই সময়ে বন্যা। বন্যার এ সময়টায় শ্রমিকদের কোনো কাজ থাকে না হাতে। এতে আরো আর্থিক সমস্যায় পড়ে বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন। অনেকের ঋণ করে কষ্ট করে পুকুরে মাছ চাষের স্বপ্নটাও ভেসে যায়। এলাকার বাজারগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যায় ফলে স্থির হয়ে পড়ে গ্রামের ক্ষুদ্র অর্থনীতিও। কৃষকের আমন ধানের চারাগুলোও বন্যার পানির নিচে অনেকদিন থাকার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে বন্যার কারণে এসব অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হয় যা থেকে কাটিয়ে ওঠা বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এই বন্যার কারণে প্রতিবছর অনেক জেলায় আমন ধানের ফসল ঠিকমতো হয় না। এতে সাধারণ ক্ষুদ্র কৃষক যারা আছেন তারা বিক্রি তো দূরে থাক অনেকে পেটের ভাতটাও ঘরে আনতে পারেন না। সব বন্যায় তলিয়ে যায়।

কোনো কোনো বছর দুই বার ধান লাগালেও বন্যায় রেহাই পায় না সেই ধান। এতে মানুষ ও গবাদিপশুর খাবারের যোগান দেওয়াটা অনেকটা কষ্টের হয়ে পড়ে। এভাবে প্রতি বছর বন্যা হবে তারপর বিভিন্ন সংস্থা বা সরকার থেকে কিছু সাহায্য আসবে আর এতেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আমরা বন্যাকবলিত মানুষ এটা চাই না। আমরা চাই আমাদের যেন কারো কাছে হাত পাততে না হয়। দেশে অনেক বড় বড় বন্যা হলেও পরবর্তী সময় বড় বন্যা মোকাবিলার জন্য কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। পদক্ষেপ গ্রহণের কথা আলোচনায় আসলেও সেসব বাস্তবায়নে তেমন গুরুত্ব থাকে না। সরকারসহ অনেক বেসরকারি সংস্থা ত্রাণ নিয়ে তখনই এগিয়ে আসে যখন বন্যার্তদের ঘরে চুলা জ্বালানোর কোনো ব্যবস্থা থাকে না। শুকনা খাবার খেয়েও অনেকে দিন কাটিয়ে দেয়। সেটাও অনেকের ঘরে থাকে না। এসব থেকে আমরা কবে স্বস্তি পাব?

বন্যা কী তাহলে আমাদের প্রতি বছর এভাবে ভাসাবে? এভাবে কাঁদাবে? পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি কুড়িগ্রামসহ যেসব জেলায় বন্যার মাত্রা চরমে পৌঁছায় সেসব এলাকার বন্যার যথাযথ কারণ বের করুণ এবং তার সমাধান একবারে করতে না পারলেও ধীরে ধীরে করার চেষ্টা করুন। আর বন্য-পূর্ববর্তী, বন্যাকালীন এবং বন্য-পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুন। এতে কিছুটা হলেও বন্যার সময় একটু স্বস্তিতে থাকতে পারব আমরা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, এমবিএ, আইবিএ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়