রেজাউল ইসলাম রেজা
সভা-সমাবেশের বক্তৃতা থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের আলোচনায়ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানান ধরনের আদেশ, উপদেশ, জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেও আমরা দ্বিধাবোধ করি না। কিন্তু কখনো সুস্থির হয়ে ভেবে দেখেছি, সমাজের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা নানান ধরনের দুর্নীতি আমাদের নিজ হাতেই গড়া। নিজেরাই রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে বড় করছি দিন দিন। বর্তমান সমাজে নেতিবাচক কিছু দেখলেই, খুব সহজেই সরকারকে কিংবা সিস্টেমকে দোষ দিই। এই ধরুন, কিছুদিন আগেও করোনা সংক্রমণের শুরুতে ইতালিফেরত প্রবাসীদের আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের শরীরে করোনা আছে কি না সেটা দেখার জন্য হজ ক্যাম্পে তাদের রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের একটুও তর সইল না। আমাদের ইগোতে আঘাত করল। যেখানে ইতালির মতো দেশের সরকার তাদের শরীরে করোনা পেল না, সেখানে বাংলাদেশ কীভাবে এই কাজটা করল। নানান রকম যুক্তি আর কটু ভাষায় দেশের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করলাম। দেশকে ছোট করলাম। সরকার, আর তার বানানো সিস্টেমকেই দোষ দিলাম। এই সিস্টেম কি আসলে সরকারের বানানো, নাকি আমাদেরও এর পেছনে হাত আছে। কিছু মানুষকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করতেও দেখা গেল। করোনার সংক্রমণের চার মাস যেতে না যেতেই, করোনা পজিটিভ না নেগেটিভ তার তোয়াক্কা না করেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যখন আবার বিদেশে পাড়ি জমাতে শুরু করল তখন দাঁড়াল আরেক ঝামেলা। আবার সেই সিস্টেম। যার থেকেই ভুয়া রিপোর্ট নিয়ে পাড়ি জমালাম ভিন দেশের মাটিতে। ফলস্বরূপ বিদেশি গণমাধ্যমের নিউজ হলাম, করোনা বোমাসহ নানান রকম নেতিবাচক শব্দে ভূষিত হয়ে দেশকে আবারও ছোট করলাম। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল বিদেশি সব ফ্লাইট। রেমিট্যান্স খাতে শুরু হলো বিপর্যয়।
শরীরে করোনা থাকা সত্ত্বেও মিথ্যার আশ্রয়ে নিয়ে ডাক্তার, নার্স, হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফদের আক্রান্ত করলাম। হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আত্মীয়স্বজনসহ আশপাশের মানুষও রেহাই পেল না। লকডাউন তো অমান্য করলামই সেই সঙ্গে ঝুঁকিতে ফেলে দিলাম দেশকে, দেশের আপামর জনসাধারণকে। করোনার সময়ে গুদামজাত করে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে দিলাম। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যেগুলো সবচেয়ে এখন বেশি জরুরি যেমন মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস প্রভৃতি জিনিসের দাম বাড়িয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিলাম। ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে সংক্রমণ আরো বহুগুণে বাড়াতে সাহায্য করলাম। করোনার মতো এমন পরিস্থিতি, যেখানে কোনো ভ্যাকসিন নেই, মৃত্যুর ভয়ে মানুষ দিশেহারা। এমন সময়ে যারা এসব অনৈতিক, অপরাধমূলক কাজে নিজেদের যুক্ত করতে একটুও দ্বিধা করলাম না।
দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অনিয়ম না করে যদি দেশের চিকিত্সাব্যবস্থাকে আরো উন্নত করতাম, তাহলে ভিন দেশের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হতো না। দেশের মানুষকে আজ বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুবরণ করতে হতো না। এখনো সময় আছে, মাথা তুলে দাঁড়াবার। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যে সিস্টেমকে দায়ী করছি প্রতিনিয়ত, সেই সিস্টেমের জন্য আমরাই দায়ী। অসচেতনতা, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত সমাজকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনার এখনি সময়। আমরা যে যার জায়গা থেকে সচেতন হলে, আইনকানুন মেনে চললে, সরকারকে সুযোগ করে দিলে, কেবল তখনই একটা ভালো সিস্টেম তৈরি হবে। তৈরি হবে সুন্দর সমাজ। দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, কৃষি, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়