করোনার তথ্য লইয়া বিভ্রান্তি

মাস্ক ব্যবহারের দরকার নাই। না, মাস্ক পরিতেই হইবে। করোনা মানুষে মানুষে ছড়ায় না। না, করোনা ভীষণ ছোঁয়াচে। উপসর্গহীন করোনা আক্রান্তদের হইতে করোনা ভাইরাস ছড়ায় না। ভুল, উপসর্গহীনদের মাধ্যমেও একইভাবে করোনা ছড়ায়। করোনা একবার হইলে অ্যান্টিবডি ছয় মাস স্থায়ী হয়। করোনার অ্যান্টিবডি তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয় না। করোনা বাতাসবাহী নহে। ভুল, করোনা বহুলাংশেই বাতাসবাহী। করোনার সূক্ষ্ম ড্রপলেট বাতাসে বহুদূর অবধি ভাসিয়া যাইতে পারে।

উপরিউক্ত স্ববিরোধী বয়ান আমরা বিভিন্ন সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং প্রভাবশালী গবেষণা জার্নাল হইতে পাইয়াছি। অর্থাত্ করোনার তথ্য লইয়া বিভ্রান্তির অন্ত নাই। ইহার বিভিন্ন প্রতিষেধক লইয়াও কম বিভ্রান্তি নাই। একেক সময় একেক ঔষধ করোনা চিকিত্সায় সম্ভাবনাময় হিসাবে প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গিয়াছে, উহারা যতখানি গর্জাইয়াছে ততখানি বর্ষায় নাই। ইহাতে সমগ্র বিশ্বই সমস্যায় পড়িয়াছে। তবে সবচাইতে অধিক সমস্যায় পড়িয়াছে উন্নয়নশীল দেশগুলি। কারণ, মান্য সংস্থা জার্নালগুলি আজ এক কথা বলিয়া আগামীকাল তাহা যদি বাতিল করিয়া দেয়, তাহা হইলে করোনা মোকাবিলায় যেই নীতিমালা তৈরি করা হয়, তাহাতে গলদ থাকিয়া যায়। কেবল তাহাই নহে, নূতন এই ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িবার নেপথ্যে তথ্যের এই বিভ্রান্তিও বহুলাংশে কাজ করিয়াছে। আসলে, ভাইরাসটি কেবল নূতনই নহে, এখনো বহুলাংশে রহস্যময়। যেইখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংস্থা হইতে একেক সময় একেক তথ্য দেওয়া হইতেছে, সেইখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে মতলববাজরা অনেক সহজেই বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াইয়া দিতে পারে। যেমন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সংবাদ ভাইরাল হইয়াছে যে, করোনা ভাইরাস আসলে ভাইরাসই নহে, ইহা ব্যাকটেরিয়া। মুশকিল হইল, সাধারণ শিক্ষিত মানুষও নূতন কোনো তথ্য পাইলে হামলাইয়া পড়ে তাহা শেয়ার করিতে। হয়তো দেখাইতে চাহে, তিনিও অনেক গোপন তথ্য জানেন। তিনি যেই গুজব ছড়াইবার কাজ করিতেছেন, তাহা বুঝিবার আগেই তাহার মতো অনেকের মাধ্যমে এই ধরনের গুজব ছড়াইয়া পড়ে। আবার সকল তথ্য যে গুজব, তাহাও নহে। যেমন, একদম তরতাজা একটি তথ্য ইন্টারনেটে ভাসিতেছে—করোনা ভাইরাস ড্রপলেটের মাধ্যমেও বংশবিস্তার করিতে পারে। বলা হইতেছে, পাঁচ মাইক্রন ড্রপলেটে এই ভাইরাস নিজেদের বংশবিস্তার করিতে পারে। বলা হইতেছে, কথা বলা কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের সময়ও ড্রপলেটের মধ্য দিয়া এই ভাইরাস ছড়াইতে পারে এবং ছয় ফুটের অধিক দূর পর্যন্ত ভাসিয়া যাইতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা গবেষকদের ভুল হইতেই পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোনো একক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান নহে। এইখানে সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা জড়িত। তাহারা যাহা বলেন সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই বলেন। এমনকি তাহা ভুল হইলে সেই ভুল স্বীকার করিতে তাহারা দ্বিধা করেন না। ইহাই বিজ্ঞান। আমরা বরং বলিতে পারি, করোনা ভাইরাস যেন অদ্ভুত এক গিরগিটি, যাহা ক্ষণে ক্ষণে রং পালটায় এবং সেই কারণেই এখন যাহা সঠিক বলিয়া মনে হইতেছে, পরবর্তী সময়ে তাহাই ভুল বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলা মুশকিল বটে।