করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশে তৃতীয় দফা বন্যায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। সরকারি ত্রাণের পাশাপাশি অন্যান্য বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেসরকারি ত্রাণ-সহায়তা দেখা গেলেও এ বছর বানভাসি মানুষের পাশে তেমন কেউ নেই। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে বাঁধ বা উঁচু স্থানে খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত করছেন তারা। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা ও টাঙ্গাইলে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, করতোয়া, ঘাঘট, পদ্মা ও যমুনার পানি বেড়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তার পানি আবারও বাড়তে শুরু করায় জেলার বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকালে ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপত্সীমার ৯২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে ও চিলমারী পয়েন্টে বিপত্সীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলায় ২৯ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রে ১৯ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
আবারও নতুন করে নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উঁচু বাঁধ, পাকা সড়ক ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া বন্যাদুর্গত মানুষজনের ঘরে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের মানুষগুলো নৌকা দেখলেই ছুটে আসছে একটু ত্রাণের আশায়। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার তিন লক্ষাধিক পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। প্রায় আড়াই শতাধিক চরের পানিবন্দি মানুষগুলো দীর্ঘ ২৮ দিন ধরে উঁচু বাঁধ বা রাস্তা, নৌকায় ও ঘরের ভেতর মাচা পেতে পানির মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে শিশুদের। চারণভূমিগুলো দীর্ঘদিন বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় গৃহপালিত পশুর খাদ্যসংকট দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ এবং ধরলা ও তিস্তার উজানে সাব হিমালয়, পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম অংশে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। নদনদীগুলোতে পানি ওঠানামা করলেও বিপত্সীমার নিচে না নামায় এবারের বন্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জেলার নদনদীর সবকটি পয়েন্টে পানি আবারও বিপত্সীমার ১ মিটার অতিক্রম করতে পারে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কোরবানি ঈদের পরেও বন্যা পরিস্থিতি চলমান থাকতে পারে।
জামালপুর :জামালপুরে তৃতীয় দফা যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত প্রায় ২৫ দিন যাবত্ প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল বেলা ৩টা নাগাদ ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অপরদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে জামালপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তৃতীয় দফা বন্যায় জেলার সাতটি উপজেলার ৬৭৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। টানা প্রায় ২৫ দিন পানিবন্দি নিম্ন-আয়ের মানুষগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। একদিকে প্রাণঘাতী করোনার থাবা, অপরদিকে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা—এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। অন্যান্য বছরে বন্যা দেখা দিলে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ অর্থবিত্তবান মানুষ। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবাদি পশুর খাদ্যসংকট চরমে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ত্রাণ পেলে বানভাসি মানুষের পেটে ভাত জুটছে।
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) :ভূঞাপুরে যমুনার পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এতে মধ্যাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এদিকে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। এছাড়া উপজেলার টেপিবাড়ী হতে নলীন পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার সড়ক হুমকিতে রয়েছে। গতকাল দুুপুর পর্যন্ত যমুনার পানি বিপত্সীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বুধবার বিকাল পর্যন্ত যা ছিল ৬১ সেন্টিমিটার। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ব্যাপক পরিমাণ জমির ফসল ও বীজতলা তলিয়ে গেছে।
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) :বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলায় তৃতীয় দফা বন্যায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত। বন্যাকবলিত এলাকার লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। উপজেলার পৌর শহরসহ আটটি ইউনিয়নের সবকটি গ্রামে বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। সড়কপথ ডুবে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বন্যাকবলিত পৌর শহর এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
নরসিংদী :সুরমা-মেঘনা নদীর পানি নরসিংদী পয়েন্টে বিপত্সীমা এখনো অতিক্রম করনি। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার রায়পুরা এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) :শাহজাদপুরে যমুনার পানি কিছুটা কমলেও বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বেড়েছে জনদুর্ভোগ। শাহজাদপুরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারিবাড়ির প্রাঙ্গণে এবং হজরত মখদুম শাহ দৌলা শহীদ ইয়ামেনি (র)-এর মাজার জামে মসজিদে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পৌর সদরসহ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কিন্তু ত্রাণ সহযোগিতা না পৌঁছানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বানভাসি মানষেরা। এদিকে উপজেলার যমুনা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর ও গুমানী নদীতে পানি একটু কমলেও বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ? মানুষেরা ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁতশিল্প খ্যাত শাহজাদপুরের তাঁত কারখানায় বন্যারপানি প্রবেশ করায় হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। খেয়ে না খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যায় দুগ্ধ সমৃদ্ধ জনপদ শাহজাদপুরে লাখ লাখ গবাদিপশু নিয়ে খামারিরা মহাবিপাকে পড়েছে।
সদরপুর (ফরিদপুর) : পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি কিছুটা কমলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। গত তিনদিনে ভারী বর্ষণের ফলে উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে ফসলি জমিতে বোনা রোপা আমন, বীজতলা, শাক-সবজি তলিয়ে গেছে। চরাঞ্চলের বানভাসী পরিবারগুলো গরু-ছাগল নিয়ে উঁচু রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মাদারীপুর : পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীভাঙন মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। জেলার ২৬টি ইউনিয়নে ভাঙন পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ৯৮২ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের অধিকাংশেরই ঘরবাড়ী নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবার অনেক পরিবার ঘরবাড়ী অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। জেলায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ইতিমধ্যে চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। শিবচরে ৯টি ইউনিয়নের ৪৩৭ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কালকিনি উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩১১ পরিবার, সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ১৭৯ পরিবার এবং রাজৈর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ৫৫ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর : গঙ্গাচড়ায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। উপজেলার লক্ষীটারী ইউনিয়নের ৫ শতাধিক ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে একটি মাদ্রাসা। পীরগাছা উপজেলার কৈকুড়ি ইউনিয়নের পিয়ারপাড়া ও কুটিরপাড়া গ্রাম ঘাঘট নদীর ভাঙনে বিলীনের পথে। ঐ দুই গ্রামের অনেকে ভিটে মাটি হারিয়ে নিস্ব হয়েছেন।
গাইবান্ধা : বাঁধ ও উঁচু স্থানে মানুষ গত ২৫ জুন থেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খাদ্যাভাব, বিশুদ্ধ পানি এবং গবাদিপশুর খাদ্যসংকট পরিস্থিতি জটিল করেছে। সরকারি ত্রাণ তত্পরতা অব্যাহত আছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। করতোয়ার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার ৬ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৮৭ সেন্টিমিটার, ঘাঘটের পানি ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ও করতোয়ার পানি ৪০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।