স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকেই মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁস হতো!

সরকারি মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল ও আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা বারবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকেই হতো বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসের মেশিনম্যান আবদুস সালামের খালাতো ভাই জসিম উদ্দিন ভুঁইয়া মুন্নুসহ পাঁচ জনকে সোমবার রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসবাদে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গ্রেফতারকৃত অপর চার জন হচ্ছেন পারভেজ খান, জাকির হোসেন দিপু, বাঁধন ও সানোয়ার হোসেন। সিআইডি গতকাল তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আবদুস সালাম গ্রেফতার হননি। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকার চেক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে সিআইডির সাইবার ক্রাইমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুল আহসান বলেন, বিষয়টি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে পুরো চক্রকে চিহ্নিত করেছে সিআইডির তদন্তকারী দল।

তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত জসিম প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতা। জসিমসহ অপর চার জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে         আনা হয়েছে। তাদের ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছেন, তারা ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে আসছেন। এ জন্য আগে কখনো তাদের পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়নি। তারা জানিয়েছেন, সারাদেশে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৫০-এর অধিক ব্যক্তি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুল আহসান জানান, গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে অর্ধশত কোটি টাকা উপার্জন করেছেন। আর টাকা দিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরো বলেন, অভিযানের সময় প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মূল হোতা জসিমের কাছ থেকে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক এবং পারভেজের কাছ থেকে ৮৪ লাখ টাকার চেক উদ্ধার করা হয়েছে।  তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির সাইবার ক্রাইমের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সুমন কুমার দাস বলেন, অভিযানের শুরুতে গত ১৯ জুলাই গ্রেফতার করা হয় সানোয়ার হোসেনকে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০ জুলাই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জসিম উদ্দিন ভুঁইয়া মুন্না, পারভেজ খান, জাকির হোসেন দিপু ও বাঁধনকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি আরো জানান, মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় ২০ জুলাই এজাহারনামীয় ১৪ জনসহ অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘মাস্টারমাইন্ড’ জসিম উদ্দিন ভুঁইয়াসহ চক্রের ১১ সদস্য সিআইডির সাইবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। 

গ্রেফতারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিআইডির একটি সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকেই  প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এ ছাড়া অধিদপ্তরের ক্ষমতাবান কর্মকর্তাদের মদতে প্রেস থেকে বহু বছর ধরে মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করতেন মেশিনম্যান আবদুস সালাম। আর তার খালাতো ভাই জসিমের কাজ ছিল সারাদেশে প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়া।

২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। এ ঘটনায় করা মামলায় ১২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয় সিআইডি, যার মধ্যে গ্রেফতার ছিল ৪৭ জন। তাদের মধ্যে ৪৬ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র  ফাঁসের মামলা তদন্তকালে ২০১৮ সালে একটি চক্রের সন্ধান পায় সিআইডি। গত ১৯ জুলাই পুলিশ জসিমের সহযোগী সানোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৭ সালের মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য দেন।